প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার করিমপুর ইউনিয়নের রজনীগঞ্জ বাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ছয়টি দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। বুধবার দিবাগত গভীর রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় বাজারজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে আগুনের লেলিহান শিখা এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ছড়িয়ে পড়লে ব্যবসায়ীদের বহু বছরের পরিশ্রম, পুঁজি ও স্বপ্ন চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যায়। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হলেও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।
স্থানীয় সূত্র ও ফায়ার সার্ভিস জানায়, গভীর রাতে বাজারের স্কুল মার্কেট এলাকায় প্রথম আগুনের সূত্রপাত ঘটে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ব্যবসায়ী আতাউর রহমানের কাপড়ের দোকান থেকেই আগুনের শুরু। রাতের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ আগুনের শিখা দেখা দিলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন। তবে ততক্ষণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পাশের দোকানগুলোতেও। মুহূর্তের মধ্যে সারজুল মিয়া, আল আমিন, আব্দুস সালাম, অজয় দাস ও শাহজাহান মিয়ার দোকানসহ মোট ছয়টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আগুনে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত গভীর হওয়ায় প্রথমদিকে আগুনের ভয়াবহতা কেউ বুঝে উঠতে পারেননি। পরে স্থানীয় লোকজন আগুন দেখতে পেয়ে চিৎকার শুরু করলে বাজারজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ব্যবসায়ী ও আশপাশের বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালান। কেউ পানি ঢালেন, কেউ দোকানের ভেতর থেকে মালামাল বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু আগুন এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে অধিকাংশ দোকান থেকে কিছুই রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
খবর পেয়ে দিরাই ফায়ার সার্ভিসের একটি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে ততক্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানগুলোর প্রায় সব মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আগুনের তীব্রতায় টিনের চাল, কাঠের তাক, কাপড়, মুদি পণ্য ও ব্যবসায়িক সরঞ্জাম মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যায়।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের অনেকেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানিয়েছেন, তাদের জীবনের একমাত্র সম্বল ছিল এই দোকানগুলো। বহু বছর ধরে ব্যবসা করে সংসার চালাতেন তারা। এখন হঠাৎ করে সব হারিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। কেউ ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন, কেউ আবার প্রবাসে থাকা স্বজনদের পাঠানো অর্থে দোকান গড়ে তুলেছিলেন। এক রাতের আগুনে তাদের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী আতাউর রহমান বলেন, রাতে হঠাৎ খবর পেয়ে বাজারে এসে দেখেন তার দোকান পুরোপুরি আগুনে জ্বলছে। কিছুই বের করতে পারেননি। দোকানে থাকা নতুন কাপড়, নগদ টাকা ও অন্যান্য মালামাল সব পুড়ে গেছে। এখন পরিবার নিয়ে কীভাবে চলবেন, সেটাই বুঝতে পারছেন না।
মুদি দোকান ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, ঈদ ও আসন্ন মৌসুমকে সামনে রেখে নতুন পণ্য তুলেছিলেন দোকানে। আগুনে সব পুড়ে যাওয়ায় তিনি সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। তিনি সরকারের সহায়তা কামনা করেন এবং দ্রুত পুনর্বাসনের দাবি জানান।
দিরাই ফায়ার সার্ভিসের ভারপ্রাপ্ত ইনচার্জ শিশির কুমার দাশ বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে তদন্ত ছাড়া সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তিনি জানান, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকার মতো হতে পারে। তবে প্রকৃত হিসাব নির্ধারণে আরও সময় লাগবে।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, গ্রামীণ বাজারগুলোতে অধিকাংশ দোকানে অপ্রতুল বৈদ্যুতিক সংযোগ, পুরোনো তার এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার অভাব থাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি সবসময়ই থাকে। বিশেষ করে রাতে দোকান বন্ধ থাকার সময় শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটলে তা দ্রুত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। রজনীগঞ্জ বাজারেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টানাখালী বাজার কমিটির সভাপতি নূরুল আমীন সরদার বলেন, গভীর রাতে আগুন লাগার কারণে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারের কাছে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য জরুরি সহায়তা দাবি করেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বাজারটিতে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার পর্যাপ্ত সুবিধা নেই। এছাড়া সংকীর্ণ গলি ও অপরিকল্পিতভাবে দোকান নির্মাণের কারণে আগুন ছড়িয়ে পড়লে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে যায়। তারা বাজার এলাকায় আধুনিক অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
দিরাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এনামুল হক অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় শোক ও উদ্বেগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। কেউ কেউ ব্যক্তিগতভাবে সহায়তার উদ্যোগও নিয়েছেন। কারণ এসব ছোট ব্যবসাই ছিল বহু পরিবারের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রামীণ বাজারগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো অনেক দুর্বল। বৈদ্যুতিক সংযোগের নিয়মিত তদারকি, নিরাপদ তার ব্যবহার, অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র স্থাপন এবং ব্যবসায়ীদের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এমন দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংও জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এক রাতের আগুনে দিরাইয়ের রজনীগঞ্জ বাজারে পুড়ে গেছে কয়েকটি দোকান নয়, বরং বহু মানুষের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম ও স্বপ্ন। এখন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের একটাই প্রত্যাশা—সরকার, প্রশাসন ও সমাজের সহানুভূতিশীল মানুষ যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়, যাতে আবার নতুন করে জীবন শুরু করার সাহস ফিরে পান তারা।


