হাওরের বুকজুড়ে শঙ্কা, ডুবছে কৃষকের স্বপ্ন

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চলজুড়ে এখন এক অদ্ভুত উৎকণ্ঠা। বৈশাখের আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা, থেমে থেমে ভারী বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা কৃষকের ঘুম কেড়ে নিয়েছে। বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে যখন হাওরাঞ্চলে বোরো ধান কাটার উৎসব থাকার কথা, তখন সেখানে এখন ভয়, দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তার ছায়া। মাঠজুড়ে সোনালী ধান দাঁড়িয়ে থাকলেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। কারণ, প্রকৃতির বৈরী আচরণ আর শ্রমিক সংকট মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে।

সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার— এই চার জেলা নিয়ে গঠিত সিলেট বিভাগের অধিকাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে বোরো মৌসুম হাওরাঞ্চলের মানুষের জন্য সারা বছরের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কৃষকেরা বছরের পর বছর ঋণ, কষ্ট আর শ্রম দিয়ে এই মৌসুমের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু এবার সেই স্বপ্নের মৌসুমই যেন অশনিসংকেতে ঘেরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সিলেট বিভাগের চার জেলায় মোট ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১১৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও হয়েছে আশাব্যঞ্জক। অনেক কৃষক বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ধানের ফলন ছিল অত্যন্ত ভালো। কিন্তু প্রকৃতির বিরূপ আচরণের কারণে সেই ফসল ঘরে তোলা নিয়েই তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা।

এখন পর্যন্ত বিভাগের মোট ধানের মাত্র ৪৬ শতাংশ কাটা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ অর্ধেকেরও বেশি ধান এখনো মাঠে পড়ে আছে। এরই মধ্যে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ১৩ হাজার ৫৬৭ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় কাটা ধানও নষ্ট হতে শুরু করেছে। কোথাও ধানে পচন ধরেছে, কোথাও আবার শুকানোর সুযোগ না থাকায় কৃষকেরা চরম বিপাকে পড়েছেন।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ দেখা দিয়েছে সুনামগঞ্জকে ঘিরে। দেশের অন্যতম বৃহৎ হাওরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত এ জেলায় এবার ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। অথচ এপ্রিলের শেষ দিন পর্যন্ত মাত্র ৪৫ শতাংশ ধান ঘরে তোলা সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ এখনো ৫৫ শতাংশ ধান মাঠে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, কয়েকদিনের মধ্যেই যদি আবহাওয়া পরিস্থিতির উন্নতি না হয়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওর এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকেরা দিন-রাত এক করে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত শ্রমিকের অভাবে সেই কাজ দ্রুত এগোচ্ছে না। অনেক জায়গায় ধান কাটার জন্য শ্রমিক পাওয়া গেলেও মজুরি এত বেশি যে তা বহন করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কৃষকেরা পরিবারের সদস্যদের নিয়েই ধান কাটার কাজে নেমেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি আর কাদামাটির কারণে কাজের গতি খুবই ধীর।

হবিগঞ্জেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এ জেলায় ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৪৪ হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ২৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশ ধান এখনো মাঠে রয়েছে। কৃষকেরা বলছেন, আকাশের দিকে তাকিয়ে দিন কাটছে। বৃষ্টি শুরু হলেই বুক ধড়ফড় করতে থাকে। কারণ, হাওরের পানি বাড়তে শুরু করলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুরো ফসল তলিয়ে যেতে পারে।

মৌলভীবাজারেও একই চিত্র। এ জেলায় ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে চাষ হওয়া ধানের মাত্র ৪৮ শতাংশ কাটা সম্ভব হয়েছে। তবে তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে সিলেট জেলা। সেখানে ৮৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় ৬৬ শতাংশ ধান ঘরে তোলা গেছে। তারপরও বাকি ধান নিয়ে উদ্বেগ কাটছে না।

আবহাওয়াবিদদের তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েকদিন সিলেট বিভাগজুড়ে ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিসহ উজানের বিভিন্ন এলাকায় প্রবল বৃষ্টিপাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেই পানি নেমে এলে সিলেট ও সুনামগঞ্জের নদ-নদীর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। এতে নতুন করে হাওর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় কৃষকেরা বলছেন, কয়েক বছর আগেও এমন দুর্যোগে হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছিল। সেই স্মৃতি এখনো তাদের তাড়া করে ফেরে। তাই এবারের পরিস্থিতি নিয়েও তারা আতঙ্কে আছেন। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ঋণ নিয়ে চাষ করেছেন। ফসল নষ্ট হলে সেই ঋণের বোঝা সামলানো তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়বে।

কৃষি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, শুধু কৃষকের ক্ষতিই নয়, এই পরিস্থিতির প্রভাব পড়তে পারে দেশের খাদ্যবাজারেও। কারণ, দেশের মোট বোরো ধানের বড় একটি অংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। যদি বিপুল পরিমাণ ফসল নষ্ট হয়, তাহলে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যেতে পারে।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে বলে জানিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার মেশিন ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত ধান কাটতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা হলো, অনেক এলাকায় এখনো প্রয়োজনের তুলনায় যান্ত্রিক সহায়তা খুবই কম।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোশাররফ হোসেন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আবহাওয়ার আরও অবনতি হলে ক্ষতির পরিমাণ বাড়তে পারে। তাই দ্রুত ধান কাটার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং প্রশাসনিক সহায়তা বাড়ানো হয়েছে।

হাওরাঞ্চলের মানুষের কাছে বোরো মৌসুম শুধু একটি ফসল কাটার সময় নয়, এটি তাদের জীবন-জীবিকার কেন্দ্রবিন্দু। সেই স্বপ্নের মৌসুম এবার রূপ নিয়েছে অনিশ্চয়তার প্রতীকে। কৃষকের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন— প্রকৃতি কি এবারও তাদের স্বপ্ন কেড়ে নেবে, নাকি শেষ পর্যন্ত সোনালী ধান নিরাপদে উঠবে গোলায়?

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মৌলভীবাজারে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাতাসের মাঝে গান শোনা নিয়ে প্রশ্ন ববি হাজ্জাজের

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত: সিইসি

প্রকাশ:২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ