প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হাওড়াঞ্চলের আকাশে জমে ওঠা কালো মেঘ যেন ক্রমেই আতঙ্কের প্রতীক হয়ে উঠছে। প্রকৃতির এই হঠাৎ রুদ্ররূপ প্রতি বছরই কেড়ে নিচ্ছে নিরীহ মানুষের জীবন, আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা—যারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার অন্যতম ভিত্তি। এমনই এক মর্মান্তিক ঘটনায় হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং ও নবীগঞ্জ উপজেলায় পৃথক বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন দুই কৃষক। একই ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন, যিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
সোমবার দুপুরের দিকে আকাশে হঠাৎ মেঘ জমে বৃষ্টি শুরু হয়, সঙ্গে ছিল তীব্র বজ্রপাত। এই সময়টিই হয়ে ওঠে দুই কৃষকের জীবনের শেষ অধ্যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সবকিছু ঘটেছে খুব অল্প সময়ের মধ্যে, কোনো প্রস্তুতির সুযোগই ছিল না।
নবীগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের বাসিন্দা মকসুদ মিয়া, বয়স মাত্র ৩৫ বছর। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিনের মতো সেদিনও তিনি গড়দার হাওরে নিজের জমিতে ধান কাটছিলেন। পরিবার-পরিজনের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য তাঁর এই পরিশ্রমই ছিল একমাত্র ভরসা। কিন্তু হঠাৎ করেই আকাশে বজ্রপাত শুরু হলে তিনি তার শিকার হন। বজ্রপাতের আঘাত এতটাই তীব্র ছিল যে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি, ফলে তাঁর মৃত্যু শুধু আবেগের ক্ষতি নয়, বরং একটি পুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।
একই সময়ে বানিয়াচং উপজেলার জাতুকর্ণপাড়া এলাকায় আরেকটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। আব্দুল সালাম, বয়স ৬০ বছর, সারা দিন হাওরে ধান কেটে বাড়ি ফেরার পথে বজ্রপাতে আক্রান্ত হন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তাঁর এমন করুণ পরিণতি স্থানীয়দের মধ্যে গভীর শোকের সৃষ্টি করেছে। তিনিও ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। তাঁর পরিবার ও প্রতিবেশীরা জানান, তিনি ছিলেন একজন পরিশ্রমী কৃষক, যিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মাঠে কাজ করেছেন।
এই দুই ঘটনার পাশাপাশি একই উপজেলায় গড়পাড়া গ্রামের সামরুজ মিয়া নামে আরেকজন কৃষক বজ্রপাতে আহত হয়েছেন। স্থানীয়ভাবে তাকে উদ্ধার করে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। তাঁর অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা না গেলেও তিনি বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম সাথী। অন্যদিকে নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন জানিয়েছেন, নিহত মকসুদ মিয়ার পরিবার অত্যন্ত দরিদ্র। তাঁর পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই ধরনের সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও প্রিয়জন হারানোর বেদনা কোনোভাবেই পূরণ হওয়ার নয়।
হবিগঞ্জসহ দেশের হাওড়াঞ্চলগুলোতে বজ্রপাত এখন এক নীরব ঘাতক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতি বছরই এই অঞ্চলে বজ্রপাতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়, যার অধিকাংশই কৃষক বা শ্রমজীবী মানুষ। কারণ তারা জীবিকার প্রয়োজনে খোলা মাঠ বা হাওড়ে কাজ করতে বাধ্য হন, যেখানে বজ্রপাতের ঝুঁকি অনেক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। হাওড়াঞ্চলের উন্মুক্ত পরিবেশ, বিস্তীর্ণ জলরাশি এবং গাছপালার স্বল্পতা বজ্রপাতের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে এই অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জন্য এটি একটি স্থায়ী বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কৃষকরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস সম্পর্কে অবগত না থাকায় বা নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় কাজ চালিয়ে যান। ফলে দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো সতর্কবার্তা পৌঁছে দিতে পারে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে অনেক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব।
একই সঙ্গে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা, যেমন—বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন, নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং গ্রাম পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন। কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও নির্দেশনাও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা বিপদের সময় দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
হবিগঞ্জের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে জীবনযাপন করা মানুষের জন্য প্রতিটি দিনই কতটা অনিশ্চয়তায় ভরা। মকসুদ মিয়া ও আব্দুল সালামের মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের জন্য নয়, বরং পুরো সমাজের জন্য একটি গভীর বেদনাদায়ক ক্ষতি।
তাদের এই মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না থাকে—বরং এটি হোক একটি সতর্কবার্তা, যা আমাদের সবাইকে আরও সচেতন ও প্রস্তুত হতে উদ্বুদ্ধ করবে। কারণ প্রতিটি প্রাণ অমূল্য, আর সেই প্রাণ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।


