প্রকাশ: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশজুড়ে সাম্প্রতিক সময়ে বজ্রপাতের ভয়াবহতা নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয় সংসদে। বিশেষ করে হাওড়াঞ্চল সুনামগঞ্জে বজ্রপাতজনিত প্রাণহানির ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে সংসদে আলোচনায় উঠে আসে। এই গুরুতর আলোচনার মাঝেই স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের একটি হালকা মন্তব্য সংসদ কক্ষে সাময়িক হাস্যরসের সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে আলোচনার একটি মানবিক দিকও তুলে ধরে।
সোমবার সংসদের অধিবেশনে জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের ওপর আলোচনার সময় সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল তাঁর বক্তব্যে অঞ্চলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর নির্বাচনী এলাকার চারটি উপজেলা হাওড়বেষ্টিত, যেখানে সারা বছর কৃষক ও মৎস্যজীবীরা জীবিকার তাগিদে হাওড়ে কাজ করেন। কিন্তু গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে এই হাওড়গুলো বজ্রপাতের ঝুঁকিতে পরিণত হয়, যা প্রায়ই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
তিনি সাম্প্রতিক এক ঘটনায় উল্লেখ করেন, দেশে অল্প সময়ের ব্যবধানে ১২ জনের প্রাণহানি ঘটেছে, যার মধ্যে তাঁর নিজের আসনেই চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এই তথ্য সংসদ সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে এবং বিষয়টির গুরুত্ব নতুন করে সামনে নিয়ে আসে। তিনি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য উদ্ধৃত করে বলেন, সুনামগঞ্জের হাওড় অঞ্চলে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫টিরও বেশি বজ্রপাত সংঘটিত হয়, যা এই অঞ্চলকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
কামরুজ্জামান কামরুল তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, বিগত সময়ে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হলেও বাস্তবিক কোনো কার্যকর কর্মসূচি এখনও দৃশ্যমান হয়নি। তিনি প্রতিটি হাওড়ে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের দাবি জানান, যাতে কৃষক ও মৎস্যজীবীরা বিপদের সময় আশ্রয় নিতে পারেন।
এই প্রেক্ষাপটে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু সংসদে সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বজ্রপাত একটি বড় ধরনের প্রাকৃতিক ঝুঁকি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বিশেষ করে হাওড় ও উত্তরাঞ্চলে এর তীব্রতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সাইরেন স্থাপন, যাতে মেঘ জমার সঙ্গে সঙ্গে কৃষকরা সতর্ক হতে পারেন এবং দ্রুত নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে পারেন। এছাড়া তালগাছ রোপণ ও বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপনের বিষয়েও গবেষণা চলছে। তিনি আরও বলেন, নতুন বিধিমালা সংশোধনের মাধ্যমে বজ্রপাতে গবাদিপশু মারা গেলেও কৃষকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, যা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্য শেষ করার পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ একটি ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ টেনে হালকা রসিকতা করেন। তিনি বলেন, “এত বজ্রপাত সুনামগঞ্জে হয়, জানলে তো বিয়েই করতাম না ওখানে।” তাঁর এই মন্তব্যে সংসদ কক্ষে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে হাসির রোল পড়ে যায়। তবে এই হাস্যরসের আড়ালেও একটি গভীর বাস্তবতা উঠে আসে—বজ্রপাতের ভয়াবহতা কতটা তীব্র হয়ে উঠেছে, তা এই মন্তব্যের মাধ্যমে সহজভাবে ফুটে ওঠে।
স্পিকারের এই মন্তব্যের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি আবেগঘন দিকও জড়িয়ে আছে। তাঁর সহধর্মিণী দিলারা হাফিজ সুনামগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল দীর্ঘ ৫৪ বছরের। সম্প্রতি তিনি চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিঙ্গাপুরে ইন্তেকাল করেন। ফলে স্পিকারের মন্তব্যে যেমন হাস্যরস ছিল, তেমনি এর ভেতরে একটি স্মৃতিময় আবেগও অনুধাবন করা যায়।
সংসদের এই আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কারভাবে উঠে এসেছে যে, বজ্রপাত এখন আর শুধু একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের জননিরাপত্তা ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বজ্রপাতের মাত্রা ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
সুনামগঞ্জসহ দেশের হাওড়াঞ্চলগুলোতে বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি নয়, বরং অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে একটি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটে সংসদে উত্থাপিত আলোচনা এবং প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা হলে তা দেশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবনরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে এটি সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে, একটি গুরুতর জাতীয় ইস্যুকে কেন্দ্র করে সংসদের আলোচনা যেমন সচেতনতা বাড়িয়েছে, তেমনি স্পিকারের মানবিক ও হালকা মন্তব্য সেই আলোচনায় ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। তবে মূল বার্তাটি স্পষ্ট—বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, নইলে এর ভয়াবহতা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে।


