প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের সীমান্তবর্তী কুলাউড়া উপজেলায় অবৈধ চোরাচালানবিরোধী অভিযানে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় সিগারেট জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। সীমান্ত এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় চোরাকারবারি চক্রের বিরুদ্ধে এই অভিযানকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অভিযানের সময় কাউকে আটক করা সম্ভব না হওয়ায় চোরাচালান চক্রের নেটওয়ার্ক ও কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, রবিবার ভোরে কুলাউড়ার আলীনগর সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়ন (৪৬ বিজিবি)। টহলরত সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই এলাকায় অভিযান চালালে মালিকবিহীন অবস্থায় ৪ হাজার ৬০৮ প্যাকেট ভারতীয় সিগারেট উদ্ধার করা হয়। জব্দকৃত এসব সিগারেটের আনুমানিক বাজার মূল্য ৯ লাখ ২১ হাজার ৬০০ টাকা, যা স্থানীয় বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে আনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানান, অভিযান চলাকালে বিজিবির উপস্থিতি টের পেয়ে চোরাকারবারিরা দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। ফলে কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে জব্দকৃত পণ্য উদ্ধার করা সম্ভব হওয়ায় সীমান্তে চোরাচালান প্রতিরোধে এটি একটি বড় সাফল্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরে চোরাচালানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে ভারতীয় সিগারেট, মাদকদ্রব্য, প্রসাধনীসহ বিভিন্ন পণ্য অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে থাকে। এসব পণ্যের একটি বড় অংশ স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করা হয়, যা একদিকে যেমন বৈধ ব্যবসায়ীদের জন্য ক্ষতির কারণ, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়েও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান একটি পুরোনো সমস্যা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে এর পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং সীমান্তের দুর্বল জায়গাগুলো ব্যবহার করে পণ্য পাচার করে। তারা মনে করেন, বিজিবির নিয়মিত টহল ও অভিযান এই কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাচালান শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও। অবৈধ পণ্য দেশের বাজারে প্রবেশ করলে তা স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি চোরাচালান চক্রের সঙ্গে অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের যোগসূত্র থাকায় এটি আইন-শৃঙ্খলার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
এই প্রেক্ষাপটে বিজিবির চলমান অভিযানগুলোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। সীমান্তে নজরদারি জোরদার করা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা—এই তিনটি বিষয় একসঙ্গে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে চোরাচালান অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি তারা স্থানীয় জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে কেউ চোরাচালান কার্যক্রমে জড়িত না হন এবং এ ধরনের তথ্য থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হয়।
এদিকে জব্দকৃত সিগারেটগুলো যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে এসব পণ্যের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সব মিলিয়ে, কুলাউড়ায় পরিচালিত এই অভিযান সীমান্তে চোরাচালানবিরোধী কার্যক্রমে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও চোরাকারবারিরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, তবুও বিপুল পরিমাণ অবৈধ পণ্য জব্দ করা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা ও তৎপরতারই প্রমাণ।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু অভিযান নয়, চোরাচালানের মূল উৎস ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে তা ভেঙে ফেলা জরুরি। অন্যথায় এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে। তাই দীর্ঘমেয়াদে একটি সমন্বিত কৌশল গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।
সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকা প্রয়োজন—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্টদের।


