প্রকাশ: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত কালনী নদীকে ঘিরে আবারও উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। একদিকে নদীর অব্যাহত ভাঙন, অন্যদিকে ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন—এই দ্বৈত চাপের মুখে পড়েছে নদী তীরবর্তী শতাধিক পরিবার। অনেকেই ইতোমধ্যে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন, আর যারা এখনো টিকে আছেন, তারা প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন—কখন ভেঙে যাবে তাদের বসতভিটা।
কালনী নদী দীর্ঘদিন ধরেই ভাঙনের জন্য পরিচিত। বর্ষা মৌসুমে নদীর স্রোত তীব্র হয়ে ওঠে, আর তখনই সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয় নদীর পাড়ে বসবাসকারী মানুষের। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে এই ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গ্রামের পর গ্রাম, ফসলি জমি, রাস্তাঘাট, এমনকি ছোট ছোট বাজারও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তবুও থামেনি এই প্রক্রিয়া।
এই সংকটের মধ্যেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে বালু উত্তোলনের বিষয়টি। অভিযোগ উঠেছে, নদীর তলদেশ থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে ড্রেজারের মাধ্যমে। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলা সংলগ্ন এলাকা থেকে এসব বালু তোলা হলেও এর পেছনে অনুমোদনের কথা বলা হচ্ছে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের। এতে করে প্রশাসনিক সীমারেখা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা, আর সেই সুযোগেই চলছে বালু উত্তোলন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা বারবার প্রতিবাদ জানালেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে বালু উত্তোলনকারীদের পক্ষ থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগও উঠেছে। শাল্লা উপজেলার এক বাসিন্দা জানান, একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান কাগজপত্র দেখিয়ে জোরপূর্বক বালু উত্তোলন করছে। প্রতিবাদ করলে উল্টো হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে।
অন্যদিকে, বালু উত্তোলনকারীদের দাবি ভিন্ন। তারা বলছেন, প্রশাসনের অনুমোদন নিয়েই নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করা হচ্ছে। তাদের মতে, সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বালু সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা একটি সরকারি প্রকল্পের অংশ। তবে এই দাবি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, কারণ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের বক্তব্যে রয়েছে ভিন্নতা।
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, আজমিরীগঞ্জ উপজেলার নির্দিষ্ট একটি এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলার অংশ থেকে বালু উত্তোলনের কোনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে যদি ওই এলাকায় বালু উত্তোলন হয়ে থাকে, তাহলে তা সম্পূর্ণ অবৈধ বলে গণ্য হবে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেছেন যে সীমান্তবর্তী এলাকায় বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তবে অন্য জেলার অংশে প্রবেশ করে কাজ করার অনুমতি নেই। এদিকে শাল্লা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া না গেলেও বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনের ভেতরে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। নদীর পাড়ে বসবাসকারী পরিবারগুলো প্রতিনিয়ত ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছেন। বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের গঠন পরিবর্তিত হচ্ছে, যা স্রোতের গতিপথকে প্রভাবিত করছে এবং ভাঙনকে আরও তীব্র করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এছাড়া পরিবেশগত দিক থেকেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদী একটি প্রাকৃতিক সম্পদ, যার ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। কিন্তু অবৈধ বা অনিয়ন্ত্রিত বালু উত্তোলনের ফলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এতে শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যত প্রজন্মও এর বিরূপ প্রভাব ভোগ করবে।
এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত রয়েছে একটি বৃহৎ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে সুনামগঞ্জ থেকে হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের কাজ চলছে, যার একটি অংশ শাল্লা থেকে জলসুখা পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রায় ৭৬৯ কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উন্নয়ন কাজের জন্য বালুর প্রয়োজন থাকলেও তা আইন মেনে এবং পরিবেশের ক্ষতি না করে সংগ্রহ করা উচিত—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়নের নামে যদি তাদের ঘরবাড়ি হারাতে হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন তাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। তারা চান, প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করুক এবং অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ করে নদী তীরবর্তী মানুষদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করুক।
সব মিলিয়ে কালনী নদীকে ঘিরে বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল সংকটের রূপ নিয়েছে। একদিকে উন্নয়ন প্রকল্প, অন্যদিকে পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে এই সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসে। কারণ প্রতিটি দিন পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীভাঙনের ঝুঁকি বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে শতাধিক পরিবারের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের শঙ্কা।


