প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজার জেলায় তীব্র গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিং, আর এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে আসন্ন এসএসসি পরীক্ষাকে সামনে রেখে জেলার হাজার হাজার পরীক্ষার্থী পড়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপে। দিনের পর দিন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের প্রস্তুতিতে তৈরি হচ্ছে বড় ধরনের ব্যাঘাত, যা অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।
জানা গেছে, চৈত্র মাসের শেষ সপ্তাহে প্রবল তাপদাহ শুরু হওয়ার পর থেকেই জেলা শহরসহ সাতটি উপজেলায় একযোগে লোডশেডিং বাড়তে থাকে। সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা ও রাত—প্রায় প্রতিটি সময়েই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার ঘটনা ঘটছে। ফলে প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন অবস্থায় থাকতে হচ্ছে জেলার প্রায় পাঁচ লাখ গ্রাহককে। এই দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে করে তুলেছে দুর্বিষহ।
সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা, যাদের পরীক্ষা শুরু হতে যাচ্ছে আগামী ২১ এপ্রিল। পড়াশোনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই সময়টিতে তারা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছে না। ফলে দিনে গরমের মধ্যে এবং রাতে অন্ধকারে পড়াশোনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষার্থী অভিযোগ করছে, যখনই তারা পড়তে বসছে, তখনই বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। এতে করে তাদের মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং প্রস্তুতিও ব্যাহত হচ্ছে।
পতনঊষার উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের পরীক্ষার্থী শাহিদ আহমদ জানায়, এমন পরিস্থিতিতে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়া—এই দুইয়ের মধ্যে পড়ে সে ও তার সহপাঠীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। পরীক্ষার ঠিক আগ মুহূর্তে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, তা তারা কল্পনাও করেনি।
এই সংকট শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং পুরো জেলার জনজীবনেই এর প্রভাব পড়েছে। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে শারীরিক অসুস্থতা বেড়ে গেছে। ঘনঘন বিদ্যুৎ যাওয়া-আসার কারণে বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিরও ক্ষতি হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতেও এর প্রভাব স্পষ্ট। শমশেরনগরের একটি বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক নজরুল ইসলাম খান বলেন, তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু ঘনঘন বিদ্যুৎ ওঠানামার কারণে এসব মেশিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং সেবা প্রদানেও বিঘ্ন ঘটছে। এতে রোগীরা যেমন ভোগান্তিতে পড়ছেন, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরাও এই পরিস্থিতিতে চরম বিপাকে পড়েছেন। জেলা শহরের ব্যবসায়ী কামরুল ইসলাম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার পর দোকান খোলা রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই দোকান বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। অথচ কর্মচারীদের বেতন, দোকান ভাড়া ও অন্যান্য খরচ ঠিকই বহন করতে হচ্ছে। এতে করে তাদের ব্যবসা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি এই সমস্যার পেছনে বিদ্যুতের সরবরাহ ঘাটতিকে দায়ী করছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জেলায় দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৫০ মেগাওয়াট হলেও গ্রিড থেকে সরবরাহ করা হচ্ছে এর মাত্র ৪৫ শতাংশ। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের এই বিশাল ব্যবধানই লোডশেডিংয়ের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী সুজিত কুমার বিশ্বাস বলেন, কয়েকদিন ধরে লোডশেডিং কিছুটা বেড়েছে, কারণ চাহিদার তুলনায় সরবরাহ অনেক কম। তিনি জানান, বর্তমানে প্রতিদিন ২০ থেকে ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এ অবস্থায় লোডশেডিং ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় থাকছে না।
তিনি আরও বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের বিদ্যুতের ব্যবহার বহুগুণে বেড়েছে। আগে যেখানে সীমিত চাহিদা ছিল, এখন তা অনেক বেশি। বিশেষ করে গরমের সময়ে ফ্যান, এসি ও অন্যান্য যন্ত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুতের চাপও বাড়ে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বৃষ্টি শুরু হলে তাপমাত্রা কমবে এবং বিদ্যুতের চাহিদাও কিছুটা হ্রাস পাবে, ফলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষ এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়। তাদের মতে, প্রতি বছর গরমের সময় একই সমস্যা দেখা দেয়, কিন্তু এর স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। তারা দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট শুধু মৌসুমি সমস্যা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, মৌলভীবাজারে বিদ্যুতের এই ভেলকিবাজি জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশেষ করে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। এখন সবার প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে উঠবে জেলা এবং মানুষ ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।


