প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় পল্লী বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। কোথাও গাছের ডাল ছুঁয়ে যাচ্ছে বৈদ্যুতিক তার, কোথাও বসতঘরের উপর দিয়ে টানা হয়েছে উচ্চ ভোল্টেজের লাইন, আবার কোথাও তার এত নিচু হয়ে এসেছে যে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া সম্ভব। এসব দৃশ্য শুধু অব্যবস্থাপনার নয়, বরং বড় ধরনের দুর্ঘটনার আগাম বার্তা বলেই মনে করছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, বহু স্থানে বিদ্যুতের খুঁটি না বসিয়ে গাছকে ব্যবহার করে লাইন টেনে নেওয়া হয়েছে, যা সম্পূর্ণ অনিরাপদ ও নিয়মবহির্ভূত। কিছু স্থানে আবার প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে তার উঁচু করে রাখার মতো অস্থায়ী ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন গ্রাহকরাই, যেন কোনোভাবে প্রাণহানি এড়ানো যায়। অথচ এসব ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, তারা বারবার পল্লী বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষকে বিষয়গুলো অবহিত করলেও প্রতিকার মেলেনি। বরং অভিযোগ রয়েছে, অনৈতিক সুবিধা দিলে দ্রুত কাজ সম্পন্ন হয়, অন্যথায় বছরের পর বছর ফাইল ঘুরে বেড়ায় অফিসের টেবিলে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই নিজের উদ্যোগে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় সামান্য পরিবর্তন এনে জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করছেন।
উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের ভবান ভট্টশ্রী গ্রামের কয়েকটি বাড়ির মাঝখান দিয়ে নেওয়া বিদ্যুতের লাইনের একটি খুঁটি ভবন নির্মাণের কারণে সরানো হলেও নতুন করে খুঁটি স্থাপন না করে গাছের সঙ্গে তার ঝুলিয়ে সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে যে কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
একই চিত্র দেখা গেছে সুড়িকান্দি গ্রামেও। সেখানে সেলিম উদ্দিনের বাড়ির উপর দিয়ে বিদ্যুতের লাইন চলে গেছে। নিজের পরিবারের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তিনি পিলারের ওপর প্লাস্টিকের পাইপ বসিয়ে তারটি কিছুটা উঁচু করে রেখেছেন। কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তিনি জানান, প্রায় দুই বছর আগে খুঁটি ও লাইন সরানোর জন্য আবেদন করলেও এখনো কোনো কাজ হয়নি।
জুড়ী উপজেলার পাতিলাসাঙ্গন গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল খালিক জানান, নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করার পর খুঁটি সরানো হলেও লাইনটি গাছ ঘেঁষে রেখে দেওয়া হয়েছে। এতে ঝড়-বৃষ্টির সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় তিনি চরম উদ্বেগে রয়েছেন।
বাছিরপুর এলাকার বাসিন্দারাও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, নতুন খুঁটি স্থাপন করা হলেও সেগুলোতে এখনো তার টানা হয়নি। অথচ নিয়মবহির্ভূতভাবে কিছু স্থানে খুঁটি বসানো হয়েছে, যা সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। স্থানীয়দের ধারণা, এসব কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে।
দোহালিয়া কুইয়ারি টিলা গ্রামে দেখা গেছে, বিদ্যুতের তার গাছের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এমন অবস্থায় থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লে এই তার পানিতে পড়ে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।
এছাড়া চুকারপুঞ্জি থেকে শেওরাডিগা পর্যন্ত বিদ্যুতের লাইনে খুঁটির দূরত্ব বেশি হওয়ায় তার নিচের দিকে ঝুলে পড়েছে। এতে পথচারী, যানবাহন এমনকি শিশুদের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। গাজিটেকা এলাকায় পুরোনো লোহার খুঁটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও তা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
স্থানীয়দের মতে, নিয়মিত তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছেন, যদি দ্রুত এসব ঝুঁকিপূর্ণ লাইন সংস্কার না করা হয়, তাহলে যেকোনো সময় প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বড়লেখা আঞ্চলিক কার্যালয়ের এজিএম মো. রুহুল আমিন জানান, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আসেনি। তবে অভিযোগ পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
অন্যদিকে সংস্থাটির ডিজিএম মো. খায়রুল বাকী খান বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ লাইনগুলো চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক সময় গ্রাহকরা খুঁটির নিচে ঘর নির্মাণের পর স্থানান্তরের আবেদন করেন, যার ফলে জটিলতা তৈরি হয়।
তবে স্থানীয়দের দাবি, বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। তারা বলছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা নিয়ম মেনেই আবেদন করেছেন, কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে কাজ হচ্ছে না। ফলে দিন দিন ঝুঁকি বাড়ছে এবং মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা মান বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। গাছের সঙ্গে লাইন জড়িয়ে থাকা, নিচু হয়ে থাকা বা বসতবাড়ির উপর দিয়ে লাইন টেনে নেওয়া—এসবই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। নিয়মিত পরিদর্শন ও দ্রুত সংস্কার ছাড়া এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার এই পরিস্থিতি শুধু অবহেলার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং এটি একটি সম্ভাব্য বিপর্যয়ের ইঙ্গিত বহন করছে। স্থানীয়দের একটাই দাবি—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে নিরাপদ বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক, যাতে আর কোনো দুর্ঘটনার শিকার না হতে হয় নিরীহ মানুষকে।


