প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল-এ এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ। সংবাদ প্রকাশের জেরে দায়ের করা এই মামলার প্রতিবাদে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে বক্তারা এটিকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
জানা গেছে, শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ এবং দৈনিক খোলা কাগজ-এর স্টাফ রিপোর্টার এহসান বিন মুজাহির-এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেন বিএনপি নেতা আলতাফুর রহমান, যিনি স্থানীয়ভাবে নাজমুল নামেও পরিচিত। অভিযোগ উঠেছে, তার বিরুদ্ধে জালিয়াতি, দুর্নীতি ও বিভিন্ন অনিয়ম সংক্রান্ত সংবাদ প্রকাশের পরই এই মামলা করা হয়।
রোববার দুপুরে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় স্থানীয় সাংবাদিকরা ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রেসক্লাবের কার্যকরী সদস্য আবুজার রহমান বাবলা। পরে সভার শেষ পর্যায়ে উপস্থিত হন প্রেসক্লাবের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আ ফ ম আব্দুল হাই ডন।
সভায় উপস্থিত সাংবাদিকরা বলেন, একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে এহসান বিন মুজাহির তার দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো তুলে ধরা গণমাধ্যমের স্বাভাবিক কাজ। কিন্তু সেই কাজের জন্য যদি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, তাহলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকিস্বরূপ হয়ে দাঁড়াবে।
বক্তারা আরও বলেন, এ ধরনের মামলা শুধু একজন সাংবাদিককে হয়রানির উদ্দেশ্যে করা হয় না, বরং এটি পুরো সাংবাদিক সমাজকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলার একটি কৌশল। এর ফলে ভবিষ্যতে অনেক সাংবাদিক গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে নিরুৎসাহিত হতে পারেন।
সভায় বক্তব্য দেন প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন, সাহিত্য ও প্রকাশনা সহ-সম্পাদক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য্য বাপনসহ আরও অনেক সদস্য। তারা সবাই একসুরে এই মামলাকে মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং হয়রানিমূলক বলে উল্লেখ করেন।
তারা বলেন, সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। আর সেই স্বাধীনতা যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে সমাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে শ্রীমঙ্গল প্রেসক্লাবের সদস্যরা পরবর্তী কর্মসূচিও ঘোষণা করেছেন। সোমবার সকাল ১১টায় প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সভা ও মানববন্ধন আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিতে সোচ্চার হবেন।
স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ঘটনা বেড়েছে, যা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে অনেক সময় রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে পড়তে হয় সাংবাদিকদের।
এ ধরনের পরিস্থিতি গণমাধ্যমের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সমাজের জন্যও ক্ষতিকর। কারণ, গণমাধ্যমের প্রধান কাজই হলো সত্য তুলে ধরা এবং জনগণের সামনে বাস্তবতা তুলে ধরা। যদি সেই কাজ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে সমাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা কমে যেতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সংবাদে আপত্তি থাকলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সেটি যেন হয় যুক্তিসংগত ও ন্যায়সংগত। সাংবাদিকদের হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলা করা হলে তা আইনের অপব্যবহার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার প্রশ্ন। সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ নিরাপদ ও স্বাধীন না হলে তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
সব মিলিয়ে, শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় ইস্যু নয়, বরং এটি দেশের গণমাধ্যমের সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে কী উদ্যোগ গ্রহণ করে।


