প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনকে ঘিরে সিলেট বিভাগের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক নতুন উদ্দীপনা ও প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ শুরু হওয়ার পরপরই অন্তত এক ডজন নারী নেত্রী এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছেন, যা এ অঞ্চলের রাজনীতিতে নারীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও এখনো দলীয়ভাবে চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়নি, তবুও সম্ভাব্য প্রার্থীদের আগাম প্রস্তুতি এবং মনোনয়নপত্র সংগ্রহের প্রবণতা রাজনীতির ভেতরে সক্রিয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র সংগ্রহকারী প্রায় সবাই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-এর রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ফলে চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার আগে দলীয় অভ্যন্তরে প্রতিযোগিতা যে তীব্র হবে, তা সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংরক্ষিত নারী আসন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব নয়, বরং এটি নারীদের জন্য জাতীয় রাজনীতিতে প্রবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। বিশেষ করে সিলেটের মতো অঞ্চলে, যেখানে পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামো রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে, সেখানে এই আসনগুলো নারীদের নেতৃত্ব বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
মনোনয়নপত্র সংগ্রহকারী নেত্রীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির স্থানীয় সরকার বিষয়ক সহ-সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য শাম্মী আক্তার। দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রাজনীতিতে থাকা এই নেত্রীর অভিজ্ঞতা তাকে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রাখছে বলে মনে করছেন অনেকে।
এছাড়া সিলেট জেলা মহিলা দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তাহসিন শারমিন তামান্না, যিনি নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার আহমদ দিনারের বোন, তিনিও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। একইভাবে সিলেট মহানগর মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক ফাহিমা আহাদ কুমকুমও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।
রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসা ব্যারিস্টার সামিরা তানজিন চৌধুরীর নামও বিশেষভাবে আলোচিত। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-এর রাজনৈতিক সচিব আবুল হারিছ চৌধুরীর মেয়ে হওয়ায় দলীয় মহলে তার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সাবেক সংসদ সদস্য প্রয়াত ড. সৈয়দ মকবুল হোসেন লেচু মিয়ার মেয়ে সৈয়দা আদিবা হোসেনও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন, যা রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাকে সামনে নিয়ে আসে। একইভাবে যুক্তরাজ্য প্রবাসী বিএনপি নেতা প্রয়াত কমর উদ্দিনের মেয়ে ছাবিনা খানও এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন।
সুনামগঞ্জসহ বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের অন্যান্য নেত্রীদের মধ্যেও ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। ছালমা আক্তার, নিহার সুলতানা তিথী, বীথিকা বিনতে হোসাইন, এডভোকেট তহমীনা আকতার হাসেমী, বিএনপির কেন্দ্রীয় সদস্য এডভোকেট মুন্নী খানম (হাদিয়া চৌধুরী মুন্নি) এবং মুনমুন তালুকদার—এই নামগুলোও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছে। প্রত্যেকেই নিজ নিজ এলাকায় সক্রিয় রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং দীর্ঘদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে আসছেন।
দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর যারা মনোনয়ন পাবেন না, তারা সাধারণত মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন না। ফলে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটাই নির্ভর করবে দলীয় সিদ্ধান্তের ওপর। এই প্রক্রিয়া দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ঐক্য ধরে রাখতে সহায়তা করে বলে মনে করা হয়।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ তারিখ ২১ এপ্রিল। এরপর ২২ ও ২৩ এপ্রিল মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করা হবে। আপিল দায়েরের সুযোগ থাকবে ২৬ এপ্রিল এবং আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২৯ এপ্রিল নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩০ এপ্রিল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে এবং সবশেষে ১২ মে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়াটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে সংসদে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়, যা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করে।
সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, শেষ পর্যন্ত কারা দলীয় মনোনয়ন পাবেন। অনেকেই মনে করছেন, দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অভিজ্ঞতা, ত্যাগ, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ নিয়ে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। অনেকেই আশা করছেন, যোগ্য ও দক্ষ নেত্রীরা মনোনয়ন পাবেন এবং তারা সংসদে গিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন। বিশেষ করে নারী উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, সংরক্ষিত নারী আসনকে কেন্দ্র করে সিলেট বিভাগের রাজনীতি এখন প্রাণবন্ত ও গতিশীল হয়ে উঠেছে। এই প্রতিযোগিতা শুধু ব্যক্তিগত প্রার্থিতার লড়াই নয়, বরং এটি নারীদের রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চূড়ান্ত মনোনয়ন ঘোষণার পর এই প্রতিযোগিতা আরও স্পষ্ট হবে এবং তখনই বোঝা যাবে, কে পাচ্ছেন দলীয় আস্থা ও সমর্থন।


