প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
চা-বাগান ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য খ্যাত মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা আজ এক ভিন্ন সংকটে জর্জরিত। এখানে বসবাসরত লাখো মানুষের চিকিৎসা সেবার একমাত্র ভরসা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দীর্ঘদিন ধরে জনবল ও অবকাঠামোগত ঘাটতিতে ধুঁকছে। চিকিৎসক সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব এবং সহায়ক কর্মীর ঘাটতি মিলিয়ে হাসপাতালটির সার্বিক সেবাব্যবস্থা এখন চরম চাপে পড়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন জানান, সীমিত জনবল ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও হাসপাতালটি সেবাদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এখানে ২ হাজার ৭২৬টি স্বাভাবিক প্রসব এবং ১১৩টি সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সর্বোচ্চ। এই সাফল্য সত্ত্বেও বাস্তবতা হলো, প্রয়োজনের তুলনায় জনবল ও অবকাঠামোর ঘাটতি দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে।
তিনি আরও জানান, ২০১২ সালে হাসপাতালটি ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও জনবল কাঠামো সেই আগের মতোই রয়ে গেছে। ফলে ৫০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমানে অনুমোদিত কাঠামোর তুলনায় প্রায় ৭৭ জন জনবলের ঘাটতি রয়েছে, যা চিকিৎসাসেবাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। কনসালটেন্ট, মেডিক্যাল অফিসার, সহকারী সার্জন এবং সিনিয়র স্টাফ নার্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে লোকবল না থাকায় রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া অনেক সময় সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি ফার্মাসিস্ট, টেকনোলজিস্ট, অফিস সহকারী, স্বাস্থ্য সহকারী, ওয়ার্ড বয়, আয়া, বাবুর্চি এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীর ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোগীদের ওপর। প্রয়োজনীয় টেকনিশিয়ানের অভাবে হাসপাতালের এক্স-রে, ইসিজি এবং আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন প্রায় ১৮ বছর ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে রোগীদের বাধ্য হয়ে বাইরে গিয়ে বেশি খরচে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদি যন্ত্রপাতি অকেজো থাকা একটি গুরুতর সমস্যা। এতে শুধু রোগ নির্ণয়েই বিলম্ব হয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে রোগের জটিলতাও বেড়ে যায়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, এখানে তিন লাখ ৬১ হাজার ৮০১ জন মানুষের জন্য মাত্র ১৬ জন চিকিৎসক কর্মরত আছেন। অর্থাৎ একজন চিকিৎসককে গড়ে ২২ হাজারেরও বেশি মানুষের চিকিৎসা সেবা দিতে হচ্ছে। যেখানে অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ রয়েছে ৩৯টি, সেখানে এই বিশাল ঘাটতি স্বাস্থ্যসেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
চিকিৎসক সংকট এতটাই তীব্র যে, ইউনিয়ন পর্যায়ের চিকিৎসকদের দিয়েও জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। এতে তৃণমূল পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে, কারণ যারা ইউনিয়নে সেবা দেওয়ার কথা, তাদেরকে উপজেলা পর্যায়ে টেনে আনতে হচ্ছে।
অন্যদিকে হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যাও কম নয়। পুরোনো ভবনের নিম্নমানের নির্মাণের কারণে বৃষ্টি হলেই ছাদ দিয়ে পানি পড়তে থাকে, যা চিকিৎসা কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করে। রোগী ও স্বজনদের জন্য এটি যেমন ভোগান্তির, তেমনি চিকিৎসকদের জন্যও কাজের পরিবেশকে কঠিন করে তোলে।
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামেরও তীব্র অভাব রয়েছে। বিপি মেশিন, স্টেথোস্কোপ, নেবুলাইজার, পালস অক্সিমিটার এবং অক্সিজেন কনসেন্ট্রেটরের মতো জরুরি যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক সময় রোগীদের প্রয়োজনীয় সেবা দিতে বিলম্ব হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থাও অত্যন্ত দুর্বল। পুরো হাসপাতালের নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন নৈশপ্রহরী। একইভাবে একটি মাত্র অ্যাম্বুলেন্স এবং একজন চালক দিয়ে পুরো উপজেলার জরুরি সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে জরুরি পরিস্থিতিতে রোগী পরিবহনে মারাত্মক সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চিকিৎসা নিতে এসে তাদের প্রায়ই ভোগান্তির শিকার হতে হয়। অনেক সময় চিকিৎসক না থাকায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়, আবার কখনো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে বাইরে যেতে হয়। এতে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই অপচয় হচ্ছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন, সীমিত সম্পদ ও জনবল নিয়ে তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। তবে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে সমাধান না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তিনি দ্রুত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান জানান, সমস্যাগুলো সম্পর্কে তারা অবগত এবং ইতোমধ্যে উচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, জেলার অন্যান্য হাসপাতালেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে এবং ধাপে ধাপে এসব সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রীমঙ্গলের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবার এই সংকট দ্রুত সমাধান করা না গেলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা সেবা একটি মৌলিক অধিকার, আর সেটি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা ও দ্রুত বাস্তবায়ন।
সবশেষে বলা যায়, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা শ্রীমঙ্গলের মানুষ আজ স্বাস্থ্যসেবার মৌলিক চাহিদা পূরণে সংগ্রাম করছে। এই সংকট শুধু একটি হাসপাতালের নয়, বরং একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জীবনের সঙ্গে জড়িত। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।


