প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ব্যস্ততম একটি অংশে প্রতিদিন জীবন ঝুঁকি নিয়ে সড়ক পারাপার করতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ। দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতার অবসান চেয়ে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার দিনারপুর এলাকায় আয়োজিত হয়েছে এক বিশাল মানববন্ধন। আন্ডারপাস নির্মাণের দাবিতে স্থানীয় জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ শুধু একটি দাবি নয়, বরং একটি নিরাপদ ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
বুধবার দুপুরে দিনারপুর দাখিল মাদ্রাসা সংলগ্ন বনগাঁওমুখী সড়কের প্রবেশপথে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধনে অংশ নেন মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সদস্যরা, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। এলাকার নানা প্রান্ত থেকে আসা মানুষজন তাদের জীবনের ঝুঁকি ও দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন।
মানববন্ধনে সভাপতিত্ব করেন দিনারপুর দাখিল মাদ্রাসার সাবেক সুপার মাওলানা আব্দুস শহীদ ঘোরী। কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান চৌধুরী শেফু, সাবেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আব্দুল মোহিত চৌধুরী, মাওলানা হাফিজুর রহমান, মাওলানা আরিফুল হক এবং মাওলানা ইব্রাহিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ।
বক্তারা তাদের বক্তব্যে তুলে ধরেন, দিনারপুর দাখিল মাদ্রাসা ছাড়াও আশপাশে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেমন হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। পাশাপাশি রয়েছে কয়েকটি জামে মসজিদ, যেখানে প্রতিদিন বহু মানুষ যাতায়াত করেন। ফলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই সড়কটি পার হতে হয় শত শত শিক্ষার্থী ও পথচারীকে।
ঢাকা-সিলেট মহাসড়কটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ হওয়ায় এখানে সারাক্ষণই ভারী যানবাহন চলাচল করে। দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহনের ভিড়ে সড়ক পারাপার হয়ে ওঠে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের জন্য এই ঝুঁকি আরও বেশি। অনেক সময় অভিভাবকরা সন্তানদের নিয়ে আতঙ্কে থাকেন, কখন কী দুর্ঘটনা ঘটে যায়।
স্থানীয়দের মতে, এই এলাকায় অন্তত ১৫টি গ্রামের মানুষ প্রতিদিন এই সড়ক ব্যবহার করেন। বাজারে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া কিংবা নামাজ আদায়সহ বিভিন্ন প্রয়োজনে তাদের এই মহাসড়ক পার হতে হয়। কিন্তু কোনো নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। অতীতে কয়েকটি দুর্ঘটনার ঘটনাও এলাকাবাসীকে আতঙ্কিত করে রেখেছে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক অভিভাবক বলেন, প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠানোর সময় ভয় কাজ করে। রাস্তা পার হতে গিয়ে যে কোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, একটি আন্ডারপাস নির্মাণ হলে এই ভয় অনেকটাই কমে যাবে এবং শিক্ষার্থীরা নিরাপদে চলাচল করতে পারবে।
একজন শিক্ষার্থী জানান, প্রতিদিন স্কুলে আসা-যাওয়ার সময় তাদের সড়ক পার হতে হয়। অনেক সময় গাড়ির ভিড় এত বেশি থাকে যে রাস্তা পার হতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এতে যেমন সময় নষ্ট হয়, তেমনি ভয়ও কাজ করে।
বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হিসেবে আন্ডারপাস নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। এটি শুধু একটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং মানুষের জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত জরুরি একটি পদক্ষেপ। তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান, বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও এই দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন। তারা বলেন, উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা মানুষের জীবনমান উন্নত করে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। একটি আন্ডারপাস নির্মাণের মাধ্যমে হাজারো মানুষের জীবন ঝুঁকি কমানো সম্ভব হলে তা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা উচিত।
মানববন্ধনে উপস্থিত জনসাধারণের চোখে-মুখে ছিল প্রত্যাশার ছাপ। তারা বিশ্বাস করেন, তাদের এই শান্তিপূর্ণ আন্দোলন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণে সহায়ক হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোর পাশে অবস্থিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শুধু আন্ডারপাস নয়, প্রয়োজন অনুযায়ী ফুটওভার ব্রিজ কিংবা অন্যান্য নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। এতে সড়ক দুর্ঘটনা কমবে এবং মানুষের জীবন আরও নিরাপদ হবে।
দিনারপুর এলাকার এই মানববন্ধন মূলত একটি বার্তা বহন করছে—উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক নির্মাণ নয়, বরং সেই সড়কে মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবশেষে বলা যায়, হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে আন্ডারপাস নির্মাণের দাবিতে অনুষ্ঠিত এই মানববন্ধন স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই দাবির প্রতি কত দ্রুত এবং কার্যকরভাবে সাড়া দেয়।


