প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট মহানগরীতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, যা স্থানীয়ভাবে টমটম ও ইজিবাইক নামে পরিচিত, সেগুলোর চলাচলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক জটিল পরিস্থিতি। নগরীর যানজট, বিশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা এবং সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই এসব যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে বিপুল সংখ্যক টমটম ও ইজিবাইক জব্দ করে পুলিশ। তবে সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্তে মানবিক দিক বিবেচনা করে জব্দ করা যানবাহনগুলো প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশ।
বুধবার, ৮ এপ্রিল দুপুরে এসএমপি সদর দপ্তরের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী। সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি, অটোরিকশা ও ইজিবাইক মালিক সমিতির নেতারা, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় মূলত মহানগরের সার্বিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাটারিচালিত যানবাহনের কারণে সৃষ্ট সমস্যাগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ রয়েছে যে, এসব যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল নগরীতে যানজট বৃদ্ধি করছে এবং সড়কে শৃঙ্খলার অভাব তৈরি করছে। একই সঙ্গে লাইসেন্সবিহীন চালক, অনিরাপদ যানবাহন এবং নির্দিষ্ট রুটের বাইরে চলাচল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তবে আলোচনায় উঠে আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক, যা হলো এসব যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকা। অনেক নিম্নআয়ের মানুষ টমটম বা ইজিবাইক চালিয়ে পরিবার চালান। হঠাৎ করে অভিযান চালিয়ে যানবাহন জব্দ করায় তারা চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে সভায় অংশগ্রহণকারীরা একটি সমঝোতামূলক সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ইতোমধ্যে জব্দ করা টমটম ও ইজিবাইকগুলো প্রকৃত মালিকদের কাছে ফেরত দেওয়া হবে। তবে এই ফেরত দেওয়া মানে এই নয় যে, সেগুলো আবার মহানগর এলাকায় চলাচলের অনুমতি পাবে। বরং স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, এসব যানবাহন সিলেট মহানগরের সীমানার মধ্যে চলতে পারবে না।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে একদিকে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত মালিকদের কিছুটা স্বস্তি দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে কঠোর অবস্থানও বজায় রাখা হয়েছে। সভায় উপস্থিত প্রায় সবাই এই সিদ্ধান্তে একমত পোষণ করেন, যা একটি সমন্বিত উদ্যোগের ইঙ্গিত দেয়।
সভা সূত্রে আরও জানা গেছে, শুধু জব্দ করা যানবাহন ফেরত দেওয়াই নয়, বরং ভবিষ্যতে এ ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের দোকানের বিরুদ্ধে অভিযান এবং অনুমোদনহীন চার্জিং পয়েন্ট বন্ধ করা। কারণ এসব অবৈধ কার্যক্রমই মূলত অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের সংখ্যা বাড়িয়ে দিচ্ছে।
নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, সিলেটের মতো দ্রুত বর্ধনশীল শহরে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অপরিকল্পিত যানবাহন বৃদ্ধি এবং সড়কের সীমিত পরিসর একসঙ্গে মিলে পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে ব্যাটারিচালিত যানবাহন নিয়ন্ত্রণ একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হলেও, তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানবিক দিক বিবেচনা করা জরুরি।
স্থানীয় এক অটোরিকশা চালক জানান, তার টমটমটি জব্দ হওয়ার পর তিনি প্রায় এক মাস বেকার ছিলেন। পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। তিনি বলেন, যানবাহনটি ফেরত পেলে অন্তত অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে কাজ করতে পারবেন। তবে নগরে চলাচল নিষিদ্ধ থাকায় তিনি কিছুটা হতাশাও প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, নগরবাসীর একটি বড় অংশ এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, নগরীর প্রধান সড়কগুলোতে টমটম ও ইজিবাইকের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল অনেক সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে এবং যানজট বাড়ায়। তাই সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। তবে একই সঙ্গে তারা চান, বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হোক, যাতে এসব চালকরা বেকার হয়ে না পড়েন।
এই সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক নেতারাও সমর্থন জানিয়েছেন। সভায় উপস্থিত মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ অন্যান্য নেতারা বলেন, জনগণের স্বার্থ রক্ষা এবং নগরীর শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এমন সমন্বিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তারা আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে আরও সুসংগঠিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নগরীতে আইনশৃঙ্খলা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে তাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে জনগণের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে, যাতে সবাই নিয়ম মেনে চলাচল করেন এবং শহরের সার্বিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখেন।
সামগ্রিকভাবে, সিলেট মহানগর পুলিশের এই সিদ্ধান্ত একটি ভারসাম্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এটি যেমন মানবিক বিবেচনাকে গুরুত্ব দিয়েছে, তেমনি নগর ব্যবস্থাপনার বাস্তবতাকেও অগ্রাধিকার দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, এই সিদ্ধান্ত কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায় এবং এর মাধ্যমে নগরীর ট্রাফিক পরিস্থিতিতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আসে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, এমন উদ্যোগের মাধ্যমে সিলেট একটি আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ এবং বাসযোগ্য শহরে পরিণত হবে, যেখানে উন্নয়ন ও মানবিকতার মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য বজায় থাকবে।


