প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলায় জ্বালানি তেল মজুদ ও বিক্রিকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসনের তৎপরতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। অবৈধভাবে জ্বালানি তেল মজুদ, সংকট তৈরি এবং কৃত্রিমভাবে মূল্য বৃদ্ধির আশঙ্কা ঠেকাতে প্রশাসন যে কঠোর অবস্থানে রয়েছে, তারই একটি বাস্তব উদাহরণ দেখা গেল এই দুই উপজেলায় পৃথক অভিযানে।
জুড়ী উপজেলায় গভীর রাতে পরিচালিত এক অভিযানে প্রায় ১,৩৫০ লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়েছে। অন্যদিকে বড়লেখা উপজেলায় পূর্বে জব্দ করা ৭২৫ লিটার ডিজেল প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করেছে প্রশাসন। এই দুই ঘটনাকে ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, যেখানে একদিকে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানকে স্বাগত জানানো হয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে।
জুড়ী উপজেলায় পরিচালিত অভিযানের সূত্রপাত ঘটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তথ্য আসে যে, সমাই বাজার এলাকায় একটি প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল মজুদ রাখা হয়েছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে বুধবার গভীর রাতে অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিনা আক্তার। তার নেতৃত্বে গঠিত একটি দল সরাসরি ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তল্লাশি চালায়।
অভিযানের সময় ‘মেসার্স ইউনিক ট্রেডার্স’ নামের প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রথমে দাবি করা হয়, সেখানে কোনো জ্বালানি তেল মজুদ নেই। তবে প্রশাসনের কর্মকর্তারা তল্লাশি চালিয়ে তাদের দাবি মিথ্যা প্রমাণ করেন। তল্লাশিতে ৬০০ লিটার ডিজেল এবং ৭৫০ লিটার পেট্রোল উদ্ধার করা হয়, যা অবৈধভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে এসব তেল জব্দ করে প্রশাসন।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, জ্বালানি তেলের মতো সংবেদনশীল পণ্য অবৈধভাবে মজুদ করলে তা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে সাধারণ ভোক্তারা ভোগান্তির শিকার হন এবং বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়। এ ধরনের অনিয়ম প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
অভিযান শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সাবরিনা আক্তার বলেন, উদ্ধারকৃত জ্বালানি তেলের পরিমাণ প্রায় ১,৪০০ লিটার। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে থানায় নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সরকার নির্ধারিত নিয়ম ভঙ্গ করে কেউ যদি জ্বালানি তেল মজুদ বা কালোবাজারি করার চেষ্টা করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে বড়লেখা উপজেলায় জব্দ করা জ্বালানি তেল বিক্রির ঘটনাটি প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোহাম্মদনগর বাজার এলাকা থেকে পূর্বে জব্দ করা ৭২৫ লিটার ডিজেল বৃহস্পতিবার দুপুরে প্রকাশ্য নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। নিলামে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আগ্রহী ক্রেতারা অংশ নেন এবং প্রতিযোগিতামূলক দরদানের মাধ্যমে তেল বিক্রি সম্পন্ন হয়।
প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জব্দকৃত পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করলে তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই দ্রুত নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করে সরকার নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। এতে একদিকে অপচয় রোধ হয়, অন্যদিকে স্বচ্ছতার মাধ্যমে জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি তেল নিয়ে নানা ধরনের অনিয়ম দীর্ঘদিন ধরেই চলে আসছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে তেল মজুদ করে রাখেন এবং পরে চাহিদা বাড়লে বেশি দামে বিক্রি করেন। এতে সাধারণ মানুষ যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি পরিবহন খাতেও এর প্রভাব পড়ে।
একজন স্থানীয় পরিবহন চালক জানান, অনেক সময় হঠাৎ করে ডিজেলের সংকট তৈরি হয়, তখন বাধ্য হয়ে বেশি দামে কিনতে হয়। এতে তাদের আয় কমে যায় এবং যাত্রীদের কাছ থেকেও বেশি ভাড়া নিতে হয়, যা সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তিনি প্রশাসনের এই ধরনের অভিযানের প্রশংসা করে বলেন, নিয়মিত তদারকি থাকলে এসব অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে।
অন্যদিকে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে সৎ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে সঠিক দামে পণ্য পাওয়া যায় না এবং ব্যবসা পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই প্রশাসনের এই উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানি তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উপাদান, যা সরাসরি দেশের পরিবহন, শিল্প এবং দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত। এই খাতে অনিয়ম হলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। তাই নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর আইন প্রয়োগের বিকল্প নেই।
সাম্প্রতিক এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, প্রশাসন চাইলে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে অবৈধ কর্মকাণ্ড দমন করা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে জনগণের সচেতনতা ও সহযোগিতাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অনিয়ম চোখে পড়লে তা দ্রুত প্রশাসনকে জানানো হলে অপরাধ প্রতিরোধ সহজ হয়।
মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার এই দুটি পৃথক ঘটনা স্থানীয় প্রশাসনের সক্রিয়তা এবং জবাবদিহিতার একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এতে একদিকে যেমন অবৈধ মজুদকারীদের জন্য সতর্কবার্তা রয়েছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জন্যও রয়েছে স্বস্তির ইঙ্গিত।
সবশেষে বলা যায়, জ্বালানি তেল নিয়ে অনিয়ম রোধে প্রশাসনের ধারাবাহিক উদ্যোগ এবং জনগণের সম্মিলিত সচেতনতা একসঙ্গে কাজ করলে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে এবং সাধারণ মানুষ তাদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিতভাবে পাবে।


