প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার চা বাগান অধ্যুষিত অঞ্চলে একমাত্র নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা কেন্দ্র ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল টানা ১৩ দিন ধরে বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন লক্ষাধিক চা শ্রমিক ও তাদের পরিবার। যে হাসপাতালটিকে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা নির্ভরতা গড়ে উঠেছিল, সেই প্রতিষ্ঠান আজ নীরব। অথচ যে মানুষগুলো ক্ষোভে ফেটে পড়ে হাসপাতালটিতে ভাঙচুর চালিয়েছিলেন, তারাই এখন আবার এই হাসপাতাল চালুর দাবি তুলছেন।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ মার্চ। শমশেরনগর চা বাগানের রবিদাস টিলার বাসিন্দা বাবুল রবিদাসের সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে ঐশী রবিদাস মাথাব্যথা নিয়ে ক্যামেলিয়া হাসপাতালে ভর্তি হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেন। তবে রাতের সময় হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা তাকে স্থানান্তর করতে রাজি হননি। পরদিন সকালে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঐশীর মৃত্যু হয়।
এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চা শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তারা অভিযোগ তোলেন, ভুল চিকিৎসার কারণেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। উত্তেজিত একদল শ্রমিক হাসপাতালে গিয়ে কর্মরত চিকিৎসক ও স্টাফদের অবরুদ্ধ করে রাখেন এবং ভাঙচুর চালান। এ সময় হাসপাতালের পরিচালকসহ কয়েকজন চিকিৎসক হেনস্তার শিকার হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্ধার করে। তবে ঘটনার পরপরই নিরাপত্তাজনিত কারণে হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
এই ঘটনার পর কেটে গেছে প্রায় দুই সপ্তাহ। কিন্তু হাসপাতালটি এখনো পুরোপুরি চালু হয়নি। প্রশাসনিক কার্যক্রম সীমিতভাবে চললেও চিকিৎসক ও নার্সদের অনুপস্থিতির কারণে রোগীরা কোনো ধরনের চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। ফলে চা বাগানের শ্রমিক পরিবারগুলো চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জেলা সদর হাসপাতাল কিংবা দূরবর্তী অন্যান্য হাসপাতালে যেতে হচ্ছে, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ৫০ শয্যাবিশিষ্ট ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতাল দীর্ঘদিন ধরে কমলগঞ্জ উপজেলার অন্তত ১৫টি চা বাগানের মানুষের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে আসছে। এখানে অস্ত্রোপচারসহ বিভিন্ন আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা পাওয়া যেত। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংকটসহ নানা কারণে কিছু সেবা সীমিত হয়ে পড়েছিল, তবুও এই হাসপাতালটি ছিল শ্রমিকদের ভরসার শেষ আশ্রয়।
বর্তমানে হাসপাতাল বন্ধ থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নারী, শিশু এবং বয়স্ক রোগীরা। অনেকেই সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে অবস্থার অবনতি ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দরিদ্র চা শ্রমিকদের পক্ষে দূরের হাসপাতালে যাওয়া সবসময় সম্ভব হয় না। ফলে অনেকেই চিকিৎসা না নিয়েই বাড়িতে পড়ে থাকছেন।
ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, হাসপাতাল পুরোপুরি বন্ধ নয়, তবে চিকিৎসকরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে কাজে ফিরছেন না। তিনি বলেন, হাসপাতালের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে হেড অফিস থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে পুনরায় চিকিৎসা কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও শ্রমিক নেতা রামভজন কৈরী বলেন, এই হাসপাতালটি চা শ্রমিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, শ্রমিক নেতারা ইতোমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং দ্রুত হাসপাতালটি চালু করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, একটি ঘটনার কারণে পুরো এলাকার মানুষকে চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রাখা উচিত নয়।
ডানকান ব্রাদার্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান বলেন, হাসপাতালটি একটি আলাদা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে পরিচালিত হয় এবং পুরো বিষয়টি তাদের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ পর্যবেক্ষণ করছে। তিনি জানান, তারাও চান দ্রুত হাসপাতালটি চালু হোক এবং শ্রমিকরা আবার আগের মতো সেবা পেতে পারেন।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, চা শ্রমিক নেতারা তার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং হাসপাতাল চালুর দাবি জানিয়েছেন। তিনি আশ্বাস দেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত একটি সমাধান বের করার চেষ্টা করা হবে।
এই ঘটনার একটি মানবিক দিকও সামনে এসেছে। যে শ্রমিকরা ক্ষোভে হাসপাতাল ভাঙচুর করেছিলেন, তারাই এখন সবচেয়ে বেশি ভুগছেন চিকিৎসা সেবা বন্ধ থাকায়। অনেকেই অনুতপ্ত হয়ে বলছেন, আবেগের বশে তারা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এখন তারা চান, হাসপাতালটি আবার চালু হোক এবং তাদের পরিবারগুলো নিরাপদ চিকিৎসা সেবা পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনা নয়, বরং এটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা, সচেতনতা এবং সংকট ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তারা বলছেন, যেকোনো চিকিৎসা জটিলতা বা মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধান হওয়া উচিত, সহিংসতা কোনো সমাধান নয়।
সব মিলিয়ে, ক্যামেলিয়া হাসপাতাল বন্ধ থাকায় কমলগঞ্জের চা বাগান এলাকাগুলোতে যে মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত সমাধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এখন সবার চোখ সেই সিদ্ধান্তের দিকে, যেটি আবারও এই হাসপাতালের দরজা খুলে দেবে এবং হাজারো মানুষের চিকিৎসার অধিকার ফিরিয়ে আনবে।


