প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জাতীয় সংসদে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিলের সঙ্গে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত বিল পাস হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের স্বাস্থ্যখাত ও উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা হলো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ দিতে যে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া চলছে, তার অংশ হিসেবেই এই বিলগুলো পাস করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট অঞ্চলের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কিত আইনটি।
মঙ্গলবার সকালে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে মোট নয়টি বিল পাস হয়, যার মধ্যে আটটি ছিল অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের ভিত্তিতে প্রণীত। এসব বিল নিয়ে সংসদে তেমন কোনো বিতর্ক বা দীর্ঘ আলোচনা হয়নি, কারণ সংশ্লিষ্ট বিশেষ কমিটি এগুলোকে অপরিবর্তিতভাবে অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল। ফলে মন্ত্রীরা বিলগুলো উত্থাপনের পর কণ্ঠভোটে সরাসরি পাস হয়ে যায়।
অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম। সংসদের কার্যক্রমে তিনি বিলগুলো পাসের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, অন্তর্বর্তী সময়ে জারি করা মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সংসদের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিতভাবে পাসের সুপারিশ করে। আরও ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধনসহ পাসের জন্য সুপারিশ করা হয়। অন্যদিকে ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি বাতিল এবং ১৬টি নতুনভাবে আরও শক্তিশালী করে বিল আকারে আনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার পাস হওয়া বিলগুলোর ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটি আগেই মতামত দিয়েছিল যে, এগুলোতে কোনো ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন নেই। ফলে সংসদে কোনো দফাওয়ারি সংশোধনী প্রস্তাব ওঠেনি এবং আলোচনা ছাড়াই বিলগুলো কণ্ঠভোটে অনুমোদন পায়।
এই অধিবেশনে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ‘বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি সংরক্ষণ বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করেন। পরিবেশ ও জলাভূমি সংরক্ষণে এ আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এরপর আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান একে একে ‘ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘দেওয়ানি আদালত (সংশোধন) বিল, ২০২৬’, ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘রেজিস্ট্রেশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উপস্থাপন করেন। প্রতিটি বিল পৃথকভাবে কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সংশোধনী বিলটি নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আসে। আইনমন্ত্রী জানান, এই আইনে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় ‘গুম’ বা বাধ্যতামূলক নিখোঁজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি বলেন, গুমের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং এই আইনি সংশোধন সেই অঙ্গীকারের প্রতিফলন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এ বিষয়ে সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছিল, তাই বিলটি উপস্থাপনের মাধ্যমে সেই অবস্থান পরিষ্কার করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাত সংশ্লিষ্ট বিলগুলোও এই অধিবেশনে বিশেষ গুরুত্ব পায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কয়েকটি আইন সংশোধনের জন্য জারি করা অধ্যাদেশগুলোকে আইনে রূপ দিতে বিল আনা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘শেখ হাসিনা মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন। পাশাপাশি ‘ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল’ও পাস করা হয়, যা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সবশেষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ‘বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে অনুমোদন পায়। এই বিলটি কার্যকর হলে সিলেট অঞ্চলে চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সিলেট অঞ্চলের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, যা চিকিৎসা শিক্ষা, গবেষণা এবং আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। নতুন এই আইনের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হলো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এর ফলে শুধু সিলেট নয়, পুরো উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মানুষ উন্নত চিকিৎসা সুবিধা পাবে এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীরা উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষার সুযোগ পাবে।
সামগ্রিকভাবে সংসদে এই বিলগুলো পাস হওয়ার মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ আইনি ভিত্তি পেল। এটি প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং উন্নয়ন কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সংসদের এই অধিবেশন প্রমাণ করেছে, প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং আইন প্রণয়নের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, বিচারব্যবস্থা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ—এই তিনটি খাতেই একযোগে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বিলসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হওয়া দেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই আইনগুলোর সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানোই হবে পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।


