প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একই দিনে পৃথক দুটি সংঘর্ষে দুইজনের প্রাণহানির ঘটনা স্থানীয় জনপদকে গভীর শোক ও উদ্বেগে নিমজ্জিত করেছে। বুধবার সন্ধ্যার দিকে রফিনগর ইউনিয়নের রফিনগর ও সাদিরপুর গ্রামে ঘটে যাওয়া এই দুই সংঘর্ষে অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন। তুচ্ছ বিষয় থেকে শুরু হয়ে সহিংসতায় রূপ নেওয়া এসব ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে গ্রামীণ বিরোধের জটিল বাস্তবতা এবং সামাজিক সহনশীলতার অভাব।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রফিনগর গ্রামের সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় অত্যন্ত তুচ্ছ একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে। একটি হাঁস নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে প্রথমে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। আব্দুল জিহাদের পক্ষের লোকজন এবং শফিক মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে এই কথা কাটাকাটি দ্রুতই উত্তেজনায় রূপ নেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, একপর্যায়ে উভয় পক্ষের লোকজন লাঠিসোঁটা নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। গ্রামজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এই সংঘর্ষে শফিক মিয়ার পক্ষের গিয়াস উদ্দিন গুরুতর আহত হন। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে দিরাই সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। একই ঘটনায় উভয় পক্ষের অন্তত ১২ জন আহত হন, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে অনেকেই স্থানীয়ভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন, আবার কয়েকজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এদিকে একই সময়ের মধ্যে রফিনগর ইউনিয়নের সাদিরপুর গ্রামে আরেকটি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যার পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা বিরোধ। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ধান শুকানোর খলার রাস্তা নিয়ে বহুদিন ধরে হোসাইন মিয়া ও আহাদ নূরের সমর্থকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলছিল। সেই বিরোধই বুধবার সন্ধ্যায় নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সাদিরপুর গ্রামের সংঘর্ষে আহাদ নূর (২৫) গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে দ্রুত দিরাই সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুতে গ্রামজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। একই ঘটনায় অন্তত ৮ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্যত্র পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
দিরাই সরকারি হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. মনি রানী তালুকদার পৃথক দুই সংঘর্ষে দুইজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং গুরুতরদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
এদিকে, ঘটনার খবর পেয়ে দিরাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে। দিরাই থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) এনামুল হক চৌধুরী জানান, পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে নিহতদের লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে এবং পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দুই গ্রামের পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে, তবে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়েছে।
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, ছোটখাটো বিরোধকে সময়মতো সমাধান না করায় তা বড় সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে। সামাজিকভাবে মধ্যস্থতা ও সহনশীলতার অভাবের কারণে এমন ঘটনা বারবার ঘটছে বলে তারা অভিযোগ করেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত বিরোধ যদি যথাসময়ে সমাধান করা না হয়, তাহলে তা সহজেই সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
এই দুটি ঘটনায় পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে গভীর শোক। নিহতদের স্বজনরা শোকে ভেঙে পড়েছেন। বিশেষ করে আহাদ নূরের অকাল মৃত্যু তার পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। একইভাবে গিয়াস উদ্দিনের মৃত্যুতে তার পরিবারে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। স্থানীয়দের অনেকেই এই ঘটনাকে অপ্রত্যাশিত ও মর্মান্তিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা এড়াতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দিরাইয়ের এই দুটি সংঘর্ষ কেবল দুটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, বরং এটি গ্রামীণ সমাজে বিরাজমান দ্বন্দ্ব, ক্ষোভ এবং সহিংসতার একটি প্রতিচ্ছবি। এই বাস্তবতা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সামাজিক সংলাপ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং সর্বোপরি মানুষের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সহনশীলতা বৃদ্ধি।


