প্রকাশ: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের ওসমানীনগরে পুলিশের অভিযানে বিপুল পরিমাণ অবৈধ ভারতীয় জিরা জব্দ এবং এক ব্যক্তিকে আটক করার ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সীমান্তবর্তী অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ পণ্য প্রবেশের যে অভিযোগ রয়েছে, এই অভিযান যেন সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকলে চোরাচালান কার্যক্রম অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বুধবার দুপুর প্রায় ১২টার দিকে উপজেলার তাজপুর কদমতলা বাজার এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ওই সময় বাজারে স্বাভাবিক বেচাকেনা চলছিল। হঠাৎ করেই পুলিশের একটি দল এসে একটি ট্রাক ঘিরে ফেলে এবং তল্লাশি শুরু করে। মুহূর্তেই এলাকাজুড়ে কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে যায়। পরে ট্রাক থেকে একের পর এক জিরার বস্তা নামানো শুরু হলে উপস্থিত জনতা বিস্মিত হয়ে পড়ে।
ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোরশেদুল আলম ভুঁইয়ার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযানে পুলিশ গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কাজ করে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কয়েকদিন ধরেই একটি চক্র সীমান্ত দিয়ে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় জিরা এনে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করছে—এমন তথ্য পুলিশের কাছে ছিল। সেই তথ্য যাচাই করেই পরিকল্পিতভাবে অভিযান চালানো হয়।
তল্লাশির এক পর্যায়ে ট্রাকটির ভেতর থেকে ১৫০ বস্তা জিরা উদ্ধার করা হয়। প্রতিটি বস্তায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জিরা থাকায় মোট উদ্ধারকৃত পণ্যের বাজারমূল্য আনুমানিক ২৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ধরনের বিপুল পরিমাণ পণ্য সাধারণ বাণিজ্যিক আমদানির আওতায় নয় বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ফলে এটি অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছে বলেই নিশ্চিত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকেই জিরা বহনকারী ট্রাকটি জব্দ করে। ট্রাকটির নম্বর ময়মনসিংহ ট-১১-০৬৮৫ বলে জানা গেছে। এ সময় ট্রাকের চালক মাঈন উদ্দিন (৩৫)কে আটক করা হয়। তিনি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার পাথনী এলাকার বাসিন্দা এবং মৃত ইউসুফ আলীর ছেলে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তিনি কিছু তথ্য দিলেও পুরো চক্রের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পুলিশ আরও তদন্ত চালাচ্ছে।
এ ঘটনায় আরও একজন জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা হলেও তিনি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, পলাতক ব্যক্তিকে শনাক্ত এবং গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এ ধরনের চোরাচালান চক্র সাধারণত একাধিক স্তরে কাজ করে এবং চালকরা অনেক সময় কেবল পরিবহনের দায়িত্বে থাকে। মূল হোতাদের শনাক্ত করা তাই অনেক ক্ষেত্রে সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়ে।
ওসি মোরশেদুল আলম ভুঁইয়া ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ফলেই এত বড় একটি চালান জব্দ করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, আটক ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে এবং জব্দকৃত পণ্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে এ ঘটনায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ বলছেন, অবৈধভাবে আনা পণ্য বাজারে প্রবেশ করলে বৈধ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। আবার অন্যরা মনে করছেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের বাণিজ্য একটি বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা বন্ধ করতে হলে আরও কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; এর পেছনে থাকা চাহিদা, সরবরাহ এবং স্থানীয় বাস্তবতাও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের ফলে অন্তত চোরাচালানকারীদের মধ্যে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ওসমানীনগরের এই অভিযান প্রমাণ করে, যথাযথ গোয়েন্দা তথ্য এবং দ্রুত পদক্ষেপ থাকলে বড় ধরনের অবৈধ বাণিজ্যও প্রতিহত করা সম্ভব। স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান আরও জোরদার করা হবে এবং যারা আইনের বাইরে গিয়ে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই ঘটনার মাধ্যমে আবারও স্পষ্ট হলো, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে চোরাচালান একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। তবে সাম্প্রতিক এই অভিযানের মতো উদ্যোগগুলো যদি ধারাবাহিকভাবে চালানো যায়, তাহলে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


