প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে এক বিরল ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে, যেখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্টাফ কোয়ার্টারের একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ‘কালনাগিনী’ নামে পরিচিত একটি সাপ। ঘটনাটি এলাকায় আতঙ্ক ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত বন বিভাগের তৎপরতায় সাপটিকে নিরাপদে উদ্ধার করে বনাঞ্চলে অবমুক্ত করা হয়েছে।
সোমবার (৬ মার্চ) রাত প্রায় ৮টার দিকে এই ঘটনাটি ঘটে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক কোয়ার্টারে। জানা যায়, কোয়ার্টারের তৃতীয় তলায় শ্রাবণ পালের বাসায় পরিবারের সদস্যরা হঠাৎ একটি সাপ দেখতে পান। অপ্রত্যাশিত এই দৃশ্যে আতঙ্কিত হয়ে তারা দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে যান এবং আশপাশে বিষয়টি জানিয়ে দেন।
পরিস্থিতি দ্রুত উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি আবাসিক এলাকায়, তাও আবার হাসপাতালের স্টাফ কোয়ার্টারের মতো জায়গায় এমন একটি সাপের উপস্থিতি স্বাভাবিকভাবেই ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তবে পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কিত হলেও তারা কোনো ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ না নিয়ে সঠিক কর্তৃপক্ষকে জানান, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের বিপদ এড়াতে সহায়তা করে।
ঘটনার খবর পেয়ে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসনিম দ্রুত পদক্ষেপ নেন। তিনি বিষয়টি অবহিত করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব-কে। খবর পাওয়ার পর উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে সাপটি নিরাপদে উদ্ধার করে।
উদ্ধারের পর সাপটি মৌলভীবাজার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা নাজমুল হক জানান, সাপটি অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে এবং এটি একটি বিরল প্রজাতির ‘কালনাগিনী’ সাপ। তিনি বলেন, এ ধরনের সাপ সাধারণত বনাঞ্চলে বসবাস করে এবং লোকালয়ে খুব কমই দেখা যায়।
উদ্ধারের পর সাপটিকে দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় এটি সুস্থ ও স্বাভাবিক আছে। এরপর রাতেই সেটিকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান-এর জানকিছড়া এলাকায় অবমুক্ত করা হয়। এই উদ্যানটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে পরিচিত, যেখানে বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল রয়েছে।
উদ্ধারকারী দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘কালনাগিনী’ সাপটি সাধারণত মানুষের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলে এবং এটি প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই এমন প্রাণী দেখা গেলে আতঙ্কিত হয়ে তা হত্যা না করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর আহ্বান জানানো হয়।
সীতেশ রঞ্জন দেব বলেন, “এই সাপটি বর্তমানে খুব একটা দেখা যায় না। এটি মূলত গভীর বনাঞ্চলে বসবাস করে। লোকালয়ে চলে আসা মানে এর প্রাকৃতিক আবাসস্থলে কোনো পরিবর্তন ঘটছে।” তার মতে, বন উজাড়, পরিবেশ পরিবর্তন বা খাদ্যের অভাবের কারণে অনেক সময় বন্যপ্রাণী লোকালয়ে চলে আসে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মানুষের বসতি এবং বনাঞ্চলের মধ্যে দূরত্ব কমে আসার ফলে এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও শহরতলির এলাকায় এ ধরনের প্রাণী দেখা গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন, যাতে মানুষ এবং প্রাণী উভয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়।
এই ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কতটা সংবেদনশীল। একদিকে আতঙ্ক, অন্যদিকে দায়িত্বশীল আচরণ—এই দুইয়ের সমন্বয়েই এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব। শ্রীমঙ্গলের এই ঘটনাটি তাই শুধু একটি উদ্ধার অভিযান নয়, বরং সচেতনতা ও মানবিকতার একটি উদাহরণ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।


