প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার মনতলা এলাকায় ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা শুধু রেল যোগাযোগেই নয়, জ্বালানি সরবরাহ ও জনজীবনেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। চট্টগ্রাম থেকে সিলেটগামী একটি তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে প্রায় ১৮ হাজার লিটার জ্বালানি তেল নষ্ট হওয়ার ঘটনায় একদিকে যেমন অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, অন্যদিকে প্রায় ১৯ ঘণ্টা সিলেটের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় হাজারো যাত্রীকে পড়তে হয়েছে চরম দুর্ভোগে।
দুর্ঘটনাটি ঘটে বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে, মনতলা রেলস্টেশনের অদূরে একটি সেতুর কাছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে পরিচালিত ৯৫১ নম্বর ট্রেনটির ছয়টি অয়েল ট্যাংকার বগি লাইনচ্যুত হয়। এর মধ্যে একটি বগি পাশের খালে পড়ে যায়, যা উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও জটিল ও সময়সাপেক্ষ করে তোলে। ট্রেনটির মোট ধারণক্ষমতা ছিল প্রায় ৩৯ হাজার লিটার জ্বালানি তেল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্ঘটনার ফলে ছড়িয়ে পড়ে।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি বগি থেকে প্রায় ৩০ শতাংশ এবং বাকি বগিগুলো থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ তেল নিখোঁজ হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ১৬ থেকে ১৮ হাজার লিটার তেল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এবিএম কামরুজ্জামান জানিয়েছেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে একটি তদন্ত কমিটি কাজ করছে এবং তাদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত হিসাব জানা যাবে।
দুর্ঘটনার পরপরই আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়া জ্বালানি সংগ্রহ করতে স্থানীয়দের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দ্রুত ঘটনাস্থলে মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ সদস্যদের। তারা প্রায় ১ হাজার লিটার ডিজেল উদ্ধার করতে সক্ষম হলেও বাকি তেলের বড় অংশ মাটিতে মিশে যায় অথবা অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। এতে পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
এই দুর্ঘটনার সরাসরি প্রভাব পড়ে সিলেট-ঢাকা ও সিলেট-চট্টগ্রাম রেলপথে। গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে তিনটি যাত্রীবাহী ট্রেন বাতিল করতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। এছাড়া আরও কয়েকটি ট্রেন বিভিন্ন স্টেশনে আটকা পড়ে, যার মধ্যে নোয়াপাড়া, শায়েস্তাগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল ও আজমপুর উল্লেখযোগ্য। দীর্ঘ সময় ধরে স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয় যাত্রীদের, অনেকেই বিকল্প পরিবহন খুঁজে নিতে বাধ্য হন। যদিও যাত্রীদের টিকিট ফেরত দেওয়া হয়েছে, তবুও তাদের সময় ও ভোগান্তির ক্ষতি পূরণ করা সম্ভব হয়নি।
রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় শুধু যাত্রী পরিবহনই নয়, পণ্য পরিবহনেও সৃষ্টি হয় বড় ধরনের বিঘ্ন। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং বাজারে পণ্যের মূল্যেও এর প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে রেলপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন মাধ্যম।
উদ্ধার কার্যক্রম ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। খালে পড়ে যাওয়া বগিটি তুলতে সময় লাগে বেশি। ভারী যন্ত্রপাতি এনে ধাপে ধাপে উদ্ধার কাজ সম্পন্ন করা হয়। অবশেষে বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উদ্ধার কাজ শেষ করে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইন মেরামত করা হয় এবং এরপর ধীরে ধীরে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।
তবে আপাতত ঝুঁকি এড়াতে ট্রেনগুলোকে সীমিত গতিতে চালানো হচ্ছে। নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সম্পূর্ণ সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত ট্রেন সর্বোচ্চ ১০ কিলোমিটার গতিতে চলাচল করবে। এতে সময়সূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আসলেও নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অতিরিক্ত গতি, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা অবকাঠামোগত দুর্বলতা—সব বিষয়ই তদন্তের আওতায় আনা হবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরনো স্লিপার, লাইনের নিচে পর্যাপ্ত পাথর ও মাটির ঘাটতি এবং দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গেল লাইনে ট্রেন চলাচল—এসব কারণেই এমন দুর্ঘটনা ঘটছে। তারা আশঙ্কা করছেন, এটি যদি যাত্রীবাহী ট্রেন হতো, তাহলে প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারত। ফলে ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে দ্রুত অবকাঠামোগত উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
এই দুর্ঘটনা আবারও দেশের রেল ব্যবস্থার দুর্বল দিকগুলো সামনে নিয়ে এসেছে। উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে এখনো অনেক জায়গায় অবহেলা ও সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দক্ষ জনবল নিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, মনতলার এই দুর্ঘটনা শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সতর্কবার্তা। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন খাতকে আরও নিরাপদ ও কার্যকর করতে এখনই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন। অন্যথায় এমন দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


