প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব ধীরে ধীরে বিশ্বব্যাপী বিস্তার লাভ করলেও এর প্রত্যক্ষ ও গভীর প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলে। প্রবাসী নির্ভর এই অঞ্চলের মানুষের জীবনে যুদ্ধ যেন এক অদৃশ্য কিন্তু তীব্র চাপ তৈরি করেছে। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, এমনকি প্রবাসে থাকা স্বজনদের জীবন নিয়েও তৈরি হয়েছে এক অজানা শঙ্কা। ফলে সিলেটজুড়ে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে, তা কেবল সাময়িক কোনো সংকট নয়, বরং বহুমাত্রিক এক বাস্তবতা।
সিলেটের বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স শুধু পরিবারের জীবিকা নির্বাহেই নয়, বরং দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকেই সেই স্থিতিশীলতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে উঠেছে। প্রবাসী কর্মীদের অনেকেই কাজ হারিয়েছেন বা কর্মক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। নিরাপত্তাহীনতা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে প্রতিদিন।
সম্প্রতি সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন দেশে অবস্থিত সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়। সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের মতো দেশগুলোতে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যেই কয়েকজন বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ায় সেই আশঙ্কা আর কল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারানোর ফলে তাদের আর্থিক অবস্থা দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, যা বৃহত্তর সমস্যার একটি প্রতীকী চিত্র।
অন্যদিকে, এই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারেও। জ্বালানির সরবরাহ নিয়ে গুজব এবং অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত মজুদের প্রবণতা দেখা দিয়েছে। পেট্রোল পাম্পগুলোতে লম্বা সারি, যানবাহনের ভিড় এবং জ্বালানি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। যদিও সরকার বারবার আশ্বস্ত করছে যে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে, তবুও মানুষের মনে সেই আস্থা পুরোপুরি ফিরছে না।
এই পরিস্থিতির মধ্যে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি এবং ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান শুরু হলে পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশন মালিকদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়। এরই প্রেক্ষিতে তারা ধর্মঘটের ডাক দিলে সিলেটজুড়ে কার্যত অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। প্রায় ১৬ ঘণ্টার এই ধর্মঘটে রাস্তাঘাটে যানবাহনের সংখ্যা ছিল ন্যূনতম, জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। যদিও পরে প্রশাসনের আশ্বাসে ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়, তবে এই ঘটনাটি মানুষের মধ্যে অস্থিরতার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়।
এর মাঝেই নতুন করে বিপর্যয় ডেকে আনে একটি ট্রেন দুর্ঘটনা। হবিগঞ্জের মাধবপুর এলাকায় জ্বালানিবাহী একটি ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে, যার মধ্যে ছিল বিপুল পরিমাণ ডিজেল। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায় ডিজেল সংগ্রহের জন্য, যা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হয়। এই ঘটনা শুধু নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়নি, বরং জ্বালানি সংকটের ভয়াবহতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
একই সময়ে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে রাত ৮টার পর দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও পরিস্থিতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। যদিও এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা তাদের আয় নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
সব মিলিয়ে সিলেটের বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল সংকটের প্রতিচ্ছবি, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা একত্রে কাজ করছে। এই অস্থিরতার দ্রুত অবসান সম্ভব কিনা, তা অনেকাংশেই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উপর। যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হবে, ততই এর প্রভাব গভীরতর হবে সিলেটসহ পুরো দেশের উপর।
তবে আশার কথা হলো, সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সক্রিয় রয়েছে। প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা—এই তিনটি বিষয়ের উপর গুরুত্ব দিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল হতে পারে। পাশাপাশি, জনগণের মধ্যে সচেতনতা এবং ধৈর্যও এই সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এই অস্থিরতার মধ্যেও সিলেটবাসী অপেক্ষা করছে স্বস্তির দিনের। তাদের প্রত্যাশা, যুদ্ধের অবসান ঘটবে, প্রবাসীরা নিরাপদে থাকবে এবং জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসবে। কিন্তু সেই দিন কবে আসবে, তা এখনো অনিশ্চিত।


