প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জে পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হলেও শ্রমিকদের একাংশ সেই সিদ্ধান্ত মেনে বাস চালাতে রাজি না হওয়ায় শুক্রবারও স্বাভাবিক হয়নি গণপরিবহন চলাচল। ফলে হবিগঞ্জ-সিলেটসহ বিভিন্ন রুটের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে চিকিৎসা, শিক্ষা, চাকরির পরীক্ষা ও জরুরি কাজে যাতায়াতের জন্য বের হওয়া মানুষকে বাসস্ট্যান্ডে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। তবে হবিগঞ্জ-ঢাকা রুটে কয়েকটি বাস সীমিতভাবে চলাচল করেছে বলে জানা গেছে।
হবিগঞ্জ-মৌলভীবাজার-সিলেট আঞ্চলিক সড়কে বাস আটকে রাখা, পরিবহন শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দুই জেলার মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করে হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ। ধর্মঘটের কারণে জেলার অভ্যন্তরীণ ও দূরপাল্লার বিভিন্ন রুটে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে হঠাৎ করেই বিপাকে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বৃহস্পতিবার রাতে মালিকপক্ষের সঙ্গে পরিবহনসংশ্লিষ্ট নেতাদের আলোচনা হয়। পরে বাংলাদেশ বাস মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক শিমুল বিশ্বাসের অনুরোধে শুক্রবার থেকে ধর্মঘট স্থগিত রাখার ঘোষণা দেয় হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপ। আগামী রোববার ঢাকায় হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বাস মালিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের নিয়ে বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়েছে বলেও জানানো হয়। তবে মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তের পরও শ্রমিকদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় তারা বাস চালাতে সম্মত হননি।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী জানান, কেন্দ্রীয় নেতাদের উদ্যোগে বিরোধের সমাধানের পথ খোঁজা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মালিকপক্ষ ধর্মঘট স্থগিত করলেও শ্রমিকেরা বিষয়টি মেনে নিতে চাইছেন না। শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।
শ্রমিকদের বক্তব্য, শুধু মালিকপক্ষের সিদ্ধান্তে বাস চালু করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব সড়কে আগে বাস আটকে রাখা, শ্রমিকদের মারধর বা হয়রানির অভিযোগ উঠেছে, সেখানে চালক ও শ্রমিকদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রয়োজন। ফলে নিরাপত্তার বিষয়ে স্পষ্ট সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তারা ঝুঁকি নিতে চান না।
পরিবহন শ্রমিক জাহাঙ্গীর মিয়ার ভাষায়, ধর্মঘটের আগে শ্রমিকদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা করা হয়নি। তাঁর আশঙ্কা, বাস আবার চলাচল শুরু করলে মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যাওয়ার পথে শ্রমিকদেরই প্রথমে হামলা বা বাধার মুখে পড়তে হতে পারে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
হবিগঞ্জের পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের সঙ্গে মৌলভীবাজারের এসএমএস পরিবহনের মালিক-শ্রমিকদের বিরোধ নতুন নয়। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বাস চলাচল, রুট ব্যবস্থাপনা ও পরিবহন কার্যক্রম নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। এর মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বাস আটকে রাখা, যানবাহন ভাঙচুর এবং শ্রমিকদের মারধরের অভিযোগও উঠেছে। এসব ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে একাধিকবার আলোচনা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি।
হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত ১১ সেপ্টেম্বর ও ২৪ সেপ্টেম্বর সিলেট থেকে মৌলভীবাজারের দিকে যাওয়ার পথে হবিগঞ্জের তিনটি বিরতিহীন এক্সপ্রেস বাস আটকে রাখা হয়। সংগঠনটির দাবি, এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে এবং বিষয়টি সমাধানের জন্য প্রশাসনের মাধ্যমে একাধিকবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জুন মাসেও দুই পক্ষের বিরোধ নিয়ে সমঝোতা বৈঠক হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও বিরোধ দেখা দেওয়ায় পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়।
অন্যদিকে, মৌলভীবাজারের পরিবহনসংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে হবিগঞ্জের মালিকদের অভিযোগের ভিন্ন ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, পরিস্থিতি যখন সমাধানের দিকে এগোচ্ছিল, তখন শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের একটি কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের মধ্যেই পরিবহন ব্যবস্থায় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে হবিগঞ্জ পৌর বাস টার্মিনালের চিত্র ছিল অস্বাভাবিক। যাত্রীবাহী বাসগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেও অধিকাংশ বাসের দরজা খোলেনি। টার্মিনালের বিভিন্ন স্থানে শ্রমিকদের জটলা দেখা যায়। বাস ছাড়বে কি না, তা নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছিলেন তাঁরা। এদিকে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য যাত্রীরা টার্মিনালে এসে অপেক্ষা করছিলেন।
অনেক যাত্রী ধর্মঘট স্থগিতের খবর শুনে টার্মিনালে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে এসে বাস না ছাড়ায় তাঁদের মধ্যে তৈরি হয় হতাশা ও অনিশ্চয়তা। কেউ জরুরি কাজে যাচ্ছিলেন, কেউ চিকিৎসার জন্য, আবার কেউ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা চাকরির পরীক্ষায় অংশ নিতে বের হয়েছিলেন। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় অনেকের দিনের গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনাই ভেস্তে যায়।
বানিয়াচং থেকে হবিগঞ্জ শহরে আসা শাহানা আক্তারের জন্য পরিস্থিতিটি ছিল আরও কঠিন। অসুস্থ সন্তানের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরীক্ষা করাতে এবং সিলেটের শাহপরাণ এলাকায় থাকা স্বামীর কাছে যেতে তিনি ভোরে ছোট ছোট সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হয়েছিলেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে হবিগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছে জানতে পারেন, বাস চলাচল বন্ধ।
ছোট সন্তানদের নিয়ে গণপরিবহনের জন্য অপেক্ষা করতে গিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন তিনি। অসুস্থ শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার প্রয়োজন থাকায় দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানো তাঁর জন্য জরুরি ছিল। কিন্তু বাস না চলায় বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁর মতো অনেক নারী, শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষও পরিবহন সংকটে পড়েছেন।
সিলেটগামী যাত্রী শফিকুল ইসলামও বাস বন্ধের কারণে বিপাকে পড়েন। তিনি আগে থেকেই ট্রেনের টিকিট কিনেছিলেন। পরিকল্পনা ছিল বাসে করে শায়েস্তাগঞ্জ রেলস্টেশনে গিয়ে সেখান থেকে ট্রেনে সিলেট যাওয়ার। কিন্তু হবিগঞ্জ থেকে স্টেশনে যাওয়ার বাস না পাওয়ায় তাঁর ট্রেনযাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছেন বানিয়াচংয়ের তরুণ শিক্ষার্থী গৌতম দাস। শুক্রবার সকাল ১০টায় সিলেটের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে তাঁর চাকরির পরীক্ষা ছিল। সেই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য তিনি ভোর ৬টার দিকে হবিগঞ্জ পৌর বাস টার্মিনালে পৌঁছান। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও কোনো বাস না ছাড়ায় তাঁর সিলেট যাত্রা সম্ভব হয়নি। প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর শেষ পর্যন্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি তিনি।
একজন চাকরিপ্রত্যাশী তরুণের কাছে একটি পরীক্ষা শুধু একটি দিনের কর্মসূচি নয়; সেটি হতে পারে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি ও ভবিষ্যতের প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি সুযোগ। পরিবহন অচলাবস্থার কারণে সেই সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় গৌতমের হতাশা তাই স্বাভাবিকভাবেই আরও গভীর হয়ে ওঠে।
পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের বিরোধের মূল বিষয়গুলো দ্রুত সমাধান না হলে এমন ভোগান্তি আবারও তৈরি হতে পারে। একটি রুটের মালিকানা, বাস চলাচলের বাধা কিংবা শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ শেষ পর্যন্ত যখন পুরো জেলার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে, তখন সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। তাঁদের অনেকেরই বিকল্প যানবাহন বা ব্যক্তিগত পরিবহনের সুযোগ নেই।
এ অবস্থায় দুই পক্ষের অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের পরিবর্তে প্রশাসন, মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বিত আলোচনার মাধ্যমে নিরাপত্তা ও বাস চলাচলের বিষয়ে কার্যকর সমাধান জরুরি হয়ে উঠেছে। আগামী রোববারের বৈঠকে দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধানের পথ বের হয় কি না, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে। ততক্ষণ পর্যন্ত বাস চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক না হলে হবিগঞ্জের সাধারণ মানুষের ভোগান্তি অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।


