সুনামগঞ্জ হাওরে উৎসব নেই, ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত কৃষকরা

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সুনামগঞ্জ জেলার সুনামগঞ্জ হাওর অঞ্চল-এ এবারের বাংলা নববর্ষের শুরুতে যেখানে দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসব-আনন্দের ঢেউ বয়ে যাচ্ছে, সেখানে হাওরের কৃষকদের জীবনে নেমে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা। উৎসবের রঙিন আবহের বদলে এখানে এখন একটাই চিন্তা, সময়মতো সোনালি ধান ঘরে তোলা। জলাবদ্ধতা, বৃষ্টির শঙ্কা এবং ফসল রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত কৃষকদের জীবনে এবারের বৈশাখ পরিণত হয়েছে এক কঠিন সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে।

হাওরাঞ্চলজুড়ে দেখা গেছে বিস্তীর্ণ জমিতে পাকা ধানের সোনালি ঢেউ। তবে সেই ধান এখন কৃষকের জন্য যেমন আনন্দের প্রতীক, তেমনি বড় দুশ্চিন্তার কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক জায়গায় ধান কাটা শুরু হলেও এখনো পুরোপুরি গতি পায়নি। নিচু জমিগুলোতে এখনো হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে থাকায় ধান কাটার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে কৃষকরা বাধ্য হচ্ছেন সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করে ফসল ঘরে তুলতে।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগাম বৃষ্টিপাত এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে এবার পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রেই ফসল রক্ষা বাঁধের কারণে পানি স্বাভাবিকভাবে বের হতে না পারায় হাওরের ভেতর জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এতে কৃষকের স্বপ্নের ফসল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কৃষকরা জানান, হাওরের নিচু জমিতে পানি জমে থাকায় ধান কাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। অনেক জায়গায় পানি সরাতে কৃষকেরা নিজেরাই উদ্যোগ নিচ্ছেন। কোথাও কোথাও বাঁধ কেটে পানি বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে এতে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্বও তৈরি হচ্ছে। এমনকি কিছু এলাকায় কৃষকদের মধ্যে বিরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা গেছে। এই সংকটের মধ্যেই একটি মর্মান্তিক ঘটনায় মধ্যনগর এলাকায় বাঁধ কাটতে গিয়ে এক তরুণ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে, যা পুরো অঞ্চলে শোকের ছায়া ফেলেছে।

কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবছর সুনামগঞ্জে প্রায় দুই লাখ তেইশ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় চৌদ্দ লাখ মেট্রিক টন, যার বাজারমূল্য কয়েক হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আগাম বৃষ্টিপাতে ইতোমধ্যে হাজার হাজার হেক্টর জমির ধান জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিভিন্ন ধাপে বৃষ্টির কারণে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ফসল তলিয়ে গেছে বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।

সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা যেমন সদর, তাহিরপুর, শাল্লা, মধ্যনগর ও ধর্মপাশা এলাকায় এখনো অনেক ধানক্ষেত পানির নিচে রয়েছে। কোথাও কোথাও ধান কাটা সম্ভব হলেও কাদাপানি ও জলাবদ্ধতার কারণে পরিবহন ও শুকানোর কাজও ব্যাহত হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচও বাড়ছে বহুগুণ।

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার এক কৃষক জানান, এবার ধান ভালো হলেও প্রকৃতির কারণে পরিস্থিতি খুবই জটিল। যেসব জমিতে পানি কম, সেখানে ধান কাটা শুরু হয়েছে, কিন্তু নিচু জমিতে পানি না নামলে কিছুই করা সম্ভব নয়। আবার নতুন করে বৃষ্টি হলে পুরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে শ্রমিক সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। অনেক শ্রমিক পানির মধ্যে কাজ করতে না চাওয়ায় তারা হাওরে যেতে অনিচ্ছুক। ফলে যারা কাজ করছেন তাদের মজুরি বেড়ে গেছে। আগে যেখানে দৈনিক মজুরি তুলনামূলক কম ছিল, এখন সেখানে অনেক বেশি খরচে শ্রমিক নিতে হচ্ছে। এতে কৃষকদের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।

একজন কৃষক জানান, তিনি বহু বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছেন। ধান কাটা শুরু হলেও শ্রমিক সংকট ও পানির কারণে কাজ ধীরগতিতে চলছে। ধান কেটে শুকনো জায়গায় রাখার পরও বৃষ্টির কারণে আবার ভিজে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। এতে পুরো পরিশ্রম ব্যর্থ হয়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে।

তাহিরপুর এলাকার এক কৃষক বলেন, নিজের ও ভাগের জমিতে ধান লাগিয়েছেন। কিছু অংশ কাটা শেষ হলেও এখনো বড় অংশ বাকি। উজান থেকে পানি এলে পুরো ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই আকাশের অবস্থার দিকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

এদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ফসল রক্ষা বাঁধসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে শত শত কিলোমিটার অস্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী পানি অপসারণের জন্য স্থানীয় কমিটিও কাজ করছে।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, অনেক জায়গায় বাঁধের নকশা ও বাস্তবায়নে ত্রুটি থাকায় পানি আটকে যাচ্ছে। এতে স্বাভাবিক জলপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে হাওরের ভেতরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে ফসল রক্ষা নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব বাঁধ।

হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের নেতারা বলছেন, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতি বছর হাওরের কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়ছেন। তাদের মতে, স্থায়ী সমাধান ছাড়া এই সংকট থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়।

অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত অল্প পরিমাণ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় ধান কাটা শুরু হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই বেশিরভাগ ধান ঘরে তোলা সম্ভব হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেছে।

সব মিলিয়ে সুনামগঞ্জের হাওরে এখন উৎসবের কোনো ছোঁয়া নেই। সেখানে চলছে সময়ের বিরুদ্ধে এক কঠিন লড়াই। কৃষকের চোখে এখন একটাই অপেক্ষা, কষ্টার্জিত সোনালি ধান নিরাপদে ঘরে তোলা। আর সেই অপেক্ষার ওপর নির্ভর করছে পুরো অঞ্চলের অর্থনীতি ও জীবনের স্বস্তি।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সাগরদিঘী ওয়াকওয়েতে ছিনতাইচেষ্টা, আটক ৩

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইলিয়াস আলীর ত্যাগে শক্ত হবে গণতন্ত্র: মন্ত্রী

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে চোরাই মোটরসাইকেলসহ যুবক আটক

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুরি-দখল মামলায় জামিন, কারাগারেই চিন্ময় দাস

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দেশজুড়ে লোডশেডিং, ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সাগরদিঘী ওয়াকওয়েতে ছিনতাইচেষ্টা, আটক ৩

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইলিয়াস আলীর ত্যাগে শক্ত হবে গণতন্ত্র: মন্ত্রী

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে চোরাই মোটরসাইকেলসহ যুবক আটক

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চুরি-দখল মামলায় জামিন, কারাগারেই চিন্ময় দাস

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দেশজুড়ে লোডশেডিং, ঘাটতি ২ হাজার মেগাওয়াট

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাসাইলামে কঠোরতা, উদ্বেগে বাংলাদেশ

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গোয়াইনঘাটে হাওর জমি বিরোধে সংঘর্ষ, একজন আটক

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে ১৪ ভারতীয় মহিষসহ তিনজন আটক

প্রকাশ: ১৭  এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ