প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় আরও এক শিশুর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ জনে। একই সঙ্গে নতুন রোগী শনাক্ত ও সন্দেহজনক ভর্তি রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্য বিভাগের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সোমবার সকালে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ বছর বয়সী এক শিশু মারা যায়। শিশুটির নাম সাজু। সে সুনামগঞ্জ জেলার শান্তিগঞ্জ উপজেলার পাথারিয়া এলাকার বাসিন্দা ছিল। চিকিৎসকরা জানান, শিশুটি দীর্ঘদিন ধরে জটিল উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন ছিল।
ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল উমর রাশেদ মুনির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, হাসপাতালে শিশুদের মধ্যে জটিল সংক্রমণজনিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে এবং অনেকেই দেরিতে হাসপাতালে আসায় ঝুঁকি আরও বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সিলেট বিভাগে মোট ৪৫ জনের শরীরে হাম ও রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে ১৪ জন করে, হবিগঞ্জে ৭ জন (এর মধ্যে ২ জন রুবেলা) এবং সিলেট জেলায় ১০ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, মৌসুমি পরিবর্তন ও টিকাদানে ঘাটতির কারণে রোগের বিস্তার বাড়তে পারে।
এদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেট বিভাগে আরও ৪১ জন সন্দেহজনক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৫ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন, সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৯ জন, জালালাবাদ রাগিব রাবেয়া হাসপাতালে ১ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ১ জন, আজমিরীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১ জন এবং জগন্নাথপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
বর্তমানে বিভাগজুড়ে বিভিন্ন হাসপাতালে মোট ১৫৩ জন সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি রয়েছে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, যেখানে ৭৯ জন চিকিৎসা নিচ্ছেন। এছাড়া ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন, সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ১১ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ২৪ জন এবং হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ১০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। অন্যান্য উপজেলা ও বেসরকারি হাসপাতালেও শিশু রোগীর চাপ রয়েছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি সংক্রামক রোগ হলেও টিকাদানের মাধ্যমে এটি প্রতিরোধযোগ্য। তবে অনেক এলাকায় এখনো নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাবও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নূরে আলম শামীম বলেন, এখন পর্যন্ত ছয়জন শিশুর মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় সিলেটের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ টিকাদান ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম সাধারণত শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যাদের পুষ্টির অভাব রয়েছে বা টিকা নেওয়া হয়নি। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের সংক্রমণসহ জটিল রোগে রূপ নিতে পারে।
অভিভাবকদের মধ্যে অনেকেই জানান, শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি ও র্যাশ দেখা দিলে অনেক সময় তারা প্রথমে সাধারণ অসুখ ভেবে গুরুত্ব দেন না। এতে চিকিৎসা নিতে দেরি হয় এবং জটিলতা বাড়ে।
স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে দ্রুত রোগী শনাক্ত, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা ব্যবস্থাও বাড়ানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে, সিলেটে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছালেও স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে টিকাদান কার্যক্রমে আরও গতি আনতে হবে এবং অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে।


