প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রাজকান্দি সংরক্ষিত বনের ভেতরে পরিচালিত এক উচ্ছেদ অভিযানকে কেন্দ্র করে বর্তমানে সমগ্র এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে যে, সরকারের বন বিভাগের পরিচালিত সেই উচ্ছেদ অভিযানে একটি অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের দীর্ঘ আট বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা বাগানের প্রায় ১ হাজার ২০০ ফলন্ত কমলা গাছ সম্পূর্ণভাবে কেটে ফেলা হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবারটির কান্নায় এবং সর্বস্ব হারানোর বেদনায় এলাকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তাদের আর্তনাদ স্থানীয় মানবতাবাদী ও সচেতন মহলকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, দীর্ঘদিন ধরে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারা বা উৎকোচ দেওয়ার পর হঠাৎ করেই আর্থিক সংকটের কারণে তা বন্ধ করে দেওয়ায়, ঠিক ফল ধরার আগমুহূর্তে সুপরিকল্পিতভাবে তাদের এই স্বপ্নের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে। অন্যদিকে, বন বিভাগের পক্ষ থেকে সমস্ত অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে দাবি করা হয়েছে যে, সংরক্ষিত বনভূমিতে যেকোনো ধরনের ফল বাগান বা অবৈধ জবরদখল সম্পূর্ণ বেআইনি বিধায় প্রচলিত আইন অনুযায়ীই এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
ঘটনার বিস্তারিত বিবরণে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই বৃহস্পতিবার আদমপুর বিটে কমলগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনারের (ভূমি) সরাসরি উপস্থিতি এবং দিকনির্দেশনায় বন বিভাগ, স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও কমলগঞ্জ থানা পুলিশের সমন্বয়ে একটি যৌথ বাহিনী চার ঘণ্টাবাপী এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করে। ওই বিশেষ অভিযানে রাজকান্দি রেঞ্জের সংরক্ষিত বনের ১৯২০ সালের বিশ ধারাভুক্ত প্রায় পাঁচ একর বনভূমি স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী ও সাধারণ মানুষের জবরদখল থেকে উদ্ধার করা হয় বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। তবে এই অভিযান ঘিরে স্থানীয় সচেতন মহলে নানা ধরনের যৌক্তিক প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় এলাকাবাসীর মনে প্রশ্ন জেগেছে যে, যদি এই বাগানটি শুরু থেকেই সম্পূর্ণ অবৈধ হয়ে থাকে, তবে গাছ রোপণের সময় কিংবা তার প্রথম এক-দুই বছরের মধ্যে কেন কোনো ধরনের আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলো না? দীর্ঘ আট বছর ধরে গাছগুলোকে বড় হওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো, অথচ ঠিক যখন গাছগুলোতে ফল ধরার সময় হলো এবং কৃষকের মুখে হাসি ফোটার উপক্রম হলো, ঠিক তখনই কেন এই আকস্মিক উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো—তা নিয়ে তীব্র রহস্য ও জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবারটির পক্ষ থেকে আরও ভয়ংকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ অনুযায়ী, শুরু থেকেই তারা স্থানীয় বন বিভাগের নির্দিষ্ট বন বিট কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যবশত এবার পারিবারিক চরম আর্থিক সংকটের কারণে সেই নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা তারা সময়মতো পরিশোধ করতে পারেননি। আর ঠিক এই অপরাধেই তাদের দীর্ঘ আট বছরের কষ্টের ফসল এবং আয়ের একমাত্র উৎস হিসেবে গড়ে ওঠা পুরো বাগানটি নির্মমভাবে কেটে মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাগানের মালিক মোছা. সালমা বেগম গণমাধ্যম ও উপস্থিত লোকজনের সামনে কান্নায় ভেঙে পড়ে জানান যে, এই বাগানটি তিল তিল করে গড়ে তুলতে তাদের গত আট বছরে সর্বমোট ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো খরচ হয়েছে। এই বিশাল অংকের টাকা তারা নিজেরা বহন করতে পারেননি, বরং বিভিন্ন বেসরকারি এনজিও এবং স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে অত্যন্ত চড়া সুদে ঋণ নিয়ে সেই টাকা এই বাগানে বিনিয়োগ করেছিলেন। তারা মনে মনে অত্যন্ত আশা করেছিলেন যে, এবার বাগান থেকে ভালো ফলন পাওয়া যাবে এবং সেই ফল বিক্রি করে ঋণের সমস্ত টাকা একবারে শোধ করে পরিবারের মুখে হাসি ফুটাবেন। অথচ বন বিভাগের এই নিষ্ঠুর অভিযান তাদের জীবনের সব স্বপ্ন এক নিমেষে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে।
সালমা বেগম ও তার স্বামী আলিম উল্লা অত্যন্ত বেদনাভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানান যে, বনের ভেতরে প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে তারা অত্যন্ত নিবিড় পরিচর্যায় দীর্ঘ আট বছর ধরে এই কমলা গাছের পাশাপাশি পেঁপে ও লাউয়ের একটি মিশ্র বাগান গড়ে তুলেছিলেন। এনজিও থেকে চড়া সুদে সংগৃহীত প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা এই বাগানের প্রতিটি গাছের পেছনে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল। তাদের সুনির্দিষ্ট হিসাব অনুযায়ী, আর মাত্র তিন মাস পরেই তারা এই বাগান থেকে প্রায় ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার পাকা কমলা ও অন্যান্য ফল বিক্রি করতে পারতেন এবং এর মাধ্যমে ঋণের একটা বড় অংশ পরিশোধ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বন বিভাগের আকস্মিক বুলডোজার ও কাটার মেশিন সেই সমস্ত স্বপ্ন মুহূর্তে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। সালমা বেগম আর্তনাদ করে বলেন, বাগান না কেটে যদি আমাদের ঘরে তালা লাগিয়ে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হতো, তাহলেও বোধ হয় এত কষ্ট পেতাম না। আজ এই বিশাল ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে আমরা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবো, কীভাবে এই চড়া সুদের ঋণ শোধ করব এবং কীভাবে পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকব, তার কোনো দিশা খুঁজে পাচ্ছি না।
স্থানীয় এলাকাবাসী এই উচ্ছেদ অভিযানকে কোনো সাধারণ সরকারি জমি উদ্ধার অভিযান হিসেবে মেনে নিতে নারাজ। তারা এটিকে সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলক এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি অভিযান বলে অভিহিত করেছেন। স্থানীয়দের তথ্যমতে, সরকারি জমি উদ্ধারের নাম করে এই অভিযান চালানো হলেও এর নেপথ্যে কাজ করেছে ব্যক্তিগত ক্ষোভ ও প্রতিশোধের আগুন। ঘটনার মাত্র কয়েক দিন আগেই স্থানীয় কিছু গণমাধ্যমে বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ এবং নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। এলাকাবাসীর জোরালো দাবি, সেই সংবাদ প্রকাশের পর সৃষ্ট ক্ষোভ ও আক্রোশ থেকেই মূলত এই পরিবারটিকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে বনের জমি বনায়নের কথা বলে টাকার বিনিময়ে অলিখিতভাবে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে পান চাষ ও জুম চাষের জন্য অবাধে ব্যবহার করতে দিচ্ছেন। অথচ সেই সমস্ত প্রকাশ্য অবৈধ স্থানে কোনো ধরনের উচ্ছেদ অভিযান না চালিয়ে, কেবল এই অসহায় ও গরিব পরিবারের তিল তিল করে গড়ে তোলা ফল বাগানটিকেই টার্গেট করে ধ্বংস করা হয়েছে।
নিষ্ঠুরতার এখানেই শেষ নয় বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তারা জানিয়েছেন, শুধু গাছ কেটে ফেলেই ক্ষান্ত হয়নি অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তি ও কর্মীরা। বরং তারা ভুক্তভোগী পরিবারের একমাত্র সম্বল ও পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত মেশিনটিও অত্যন্ত আক্রোশের সঙ্গে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে, যাতে এই ধ্বংসযজ্ঞের পরও যদি কোনো একটি গাছ বেঁচে থাকে, তবে তাও যেন পানির অভাবে শুকিয়ে মারা যায়। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাগানের চারদিকে মর্মান্তিক দৃশ্য—ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে তাজা কাটা কমলা গাছের সবুজ ডালপালা ও আধপাকা ফল। সেই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া বাগানের মাঝখানে সম্পূর্ণ নির্বাক ও দিশাহারা হয়ে বসে আছেন সালমা বেগম ও তার পরিবারের সদস্যরা। একে তো মাথার ওপর বিশাল অঙ্কের ঋণের কিস্তির চাপ, অন্যদিকে সংসারের ভবিষ্যৎ ও জীবিকার একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে তাদের দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর অন্ধকারে।
উঠে আসা এই সমস্ত গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে গেলে রাজকান্দি রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা প্রীতম বড়ুয়া সাফ জানিয়ে দেন যে, সংরক্ষিত বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের জবরদখল—তা সেটি পান চাষ হোক, কমলা চাষ হোক কিংবা আনারস চাষ হোক না কেন—আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং অপরাধ। বনের জমি অবৈধ দখলমুক্ত করতে বন বিভাগের নিয়মিত উচ্ছেদ তৎপরতা সর্বদা চলমান রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও বলেন, এটি একটি জবরদখল করা ভূমি, সুতরাং সেটি আট বছর হোক কিংবা দশ বছর হোক, যত বছরই অবৈধ দখলে থাকুক না কেন, তা বেআইনিই থাকবে। বন বিভাগ যেকোনোমূল্যে যেকোনো ধরনের জবরদখল উচ্ছেদ করতে বদ্ধপরিকর। রাজকান্দি রেঞ্জের অধীনে যত জবরদখলকৃত জমি রয়েছে, আমরা পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে সেগুলোকে অবমুক্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। প্রতি মাসেই আমাদের এ ধরনের একাধিক যৌথ উচ্ছেদ অভিযান নিয়মিত পরিচালিত হয়। তবে টাকা দিলে একটি অবৈধ বাগান আট বছর ধরে বৈধ থাকে, আর টাকা দেওয়া বন্ধ করলেই তা রাতারাতি ধ্বংস করে দেওয়া হয় কেন—সাংবাদিকদের এমন সুনির্দিষ্ট ও ইমোশনাল প্রশ্নের কোনো সদুত্তর বা সরাসরি জবাব দিতে পারেননি এই বন কর্মকর্তা।
সার্বিক বিষয়ে সিলেট বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান জানান যে, ১৯২০ সালের দিকে ব্রিটিশ আমলে যখন প্রথম ভিলেজার সিস্টেম চালু করা হয়েছিল, তখন নির্দিষ্ট কিছু পরিবারকে কেবল পাহাড়ের নিচের নিচু জমিতে অর্থাৎ ভ্যালিতে কেবল ধান চাষের জন্য সাময়িকভাবে জমি ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল। পাহাড় বা টিলার ওপরে ফল বাগান করার বা স্থায়ী স্থাপনা তৈরি করার কোনো ধরনের বিধান বা আইনি সুযোগ বন আইনে কখনোই ছিল না। সুতরাং কখন, কে বা কারা এই অবৈধ বাগান লাগানোর অনুমতি দিয়েছিল, তার কোনো আইনি ভিত্তি থাকতে পারে না। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন যে, সংরক্ষিত বনের জমিতে কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত কোনো ফল বাগান থাকতে পারবে না, সেখানে শুধুমাত্র বনায়ন করা হবে—এই সুনির্দিষ্ট সরকারি নীতি অনুসারেই এই অবৈধ বাগান কেটে বনভূমি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মী যদি এই ধরনের কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত থেকে থাকে, তবে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


