প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভারতের চিকিৎসা শিক্ষায় প্রবেশিকা পরীক্ষা বা নিট (NEET) কে কেন্দ্র করে বিগত বেশ কিছুদিন ধরে দেশজুড়ে যে তীব্র ও অভাবনীয় আন্দোলনের সৃষ্টি হয়েছিল, তার চরম পরিণতিতে অবশেষে পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন দেশটির কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। পরীক্ষাসংক্রান্ত নানা ধরনের গুরুতর অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশাসনিক চরম ব্যর্থতা এবং লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অভিযোগে চারদিক থেকে প্রবল চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি। সরকারের সঙ্গে সুনির্ধারিত কোনো তৃতীয় দফার আনুষ্ঠানিক বৈঠকের আগেই আন্দোলনকারী ছাত্র-যুব সংগঠনের পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া কঠোর সময়সীমা এবং চূড়ান্ত চরমপত্র মেনে তিনি নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন। এই হাই-প্রোফাইল পদত্যাগের ঘটনাটি কেবল ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনেই নয়, বরং সমগ্র দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সাধারণ মানুষের মনে এক বিশাল নাড়া দিয়েছে। দেশজুড়ে চলমান এই সংকটময় পরিস্থিতিতে শিক্ষামন্ত্রীর এই প্রস্থান নিট আন্দোলনের ইতিহাসে এক অতি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।
ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল প্রায় এক মাস আগে, যখন নিট পরীক্ষা ঘিরে দেশজুড়ে একের পর এক অভিযোগ উঠতে শুরু করে। পরীক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেওয়ার উপক্রম হলে তার প্রতিবাদে ক্ষোভে ফেটে পড়ে দেশের ছাত্রসমাজ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই আন্দোলন কেবল আর সাধারণ কোনো ছাত্র বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি এক বিরাট জন আন্দোলনে রূপ নেয়। পরিস্থিতি যখন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়, তখন নড়েচড়ে বসে কেন্দ্রীয় সরকার। সংকট নিরসনের উদ্দেশ্যে আন্দোলনের মূল নেতৃত্বদানকারী ও সামনের সারিতে থাকা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপির শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে বসেন কেন্দ্রীয় সরকারের দুই অত্যন্ত প্রভাবশালী মন্ত্রী জেপি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। দীর্ঘ প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অত্যন্ত রুদ্ধদ্বার ও টানটান উত্তেজনার মধ্য দিয়ে সেই ম্যারাথন বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
তবে সরকারের শীর্ষমন্ত্রীদের সঙ্গে সেই দীর্ঘ আলোচনা চললেও তা শেষ পর্যন্ত কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। সিজেপির দুই প্রধান প্রতিনিধি সৌরভ দাস এবং আশুতোষ রাঙ্কা অত্যন্ত স্পষ্ট ও কঠোর ভাষায় জানিয়ে দেন যে, দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার এই চরম বিপর্যয় এবং পরীক্ষার্থীদের দুর্দশার প্রধান দায় শিক্ষামন্ত্রীর। তাই কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ না ঘটালে তারা সরকারের সঙ্গে আর কোনো ধরনের আপস, আলোচনা বা মধ্যস্থতায় যাবেন না। বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন আশ্বাসের কথা বলা হলেও আন্দোলনকারীরা তাদের দাবিতে সম্পূর্ণ অটল থাকেন। শিক্ষামন্ত্রীকে অবিলম্বে পদ থেকে অপসারণ করার জন্য সিজেপির পক্ষ থেকে শনিবার বিকেল পর্যন্ত একটি কঠোর সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রকাশ্য হুশিয়ারি উচ্চারণ করা হয় যে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যদি এই দাবি মেনে নেওয়া না হয়, তবে আগামী সপ্তাহ থেকে রাজধানী দিল্লি সহ গোটা দেশজুড়ে আরও অনেক বেশি তীব্র, কঠোর এবং সর্বাত্মক আন্দোলন গড়ে তোলা হবে, যার সম্পূর্ণ দায়ভার বর্তাবে সরকারের ওপর।
আন্দোলনকারীদের সেই অনড় অবস্থান এবং কঠোর চরমপত্রের পর দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে প্রচণ্ড চাপের সৃষ্টি হয়। সরকার বুঝতে পেরেছিল যে, এই মুহূর্তে আন্দোলন দমনের অন্য কোনো পথ খোলা নেই। ফলস্বরূপ, শনিবার সকালেই সিজেপির পক্ষ থেকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে পুনরায় স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যে, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ ছাড়া এই অচলাবস্থা কাটানোর আর কোনো বিকল্প নেই। আন্দোলনকারীদের এই অটল ও আপসহীন মনোভাবের মুখে শেষ পর্যন্ত হার মানতে বাধ্য হয় প্রশাসন। শনিবার সকালেই নিজের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে রাষ্ট্রপতি বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে নিজের পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। নিজের পদত্যাগপত্রে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, গত দশ দিনের বিভিন্ন ঘটনাক্রম তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছে এবং তাঁর মন ভারাক্রান্ত। তবে সেই সঙ্গে তিনি এও উল্লেখ করতে ভোলেননি যে, দেশের যুবশক্তিই হলো ভারতের আসল শক্তি। যুব সমাজের স্বার্থ এবং দেশের বৃহত্তর কল্যাণের কথা মাথায় রেখেই তিনি এই কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন বলে জানান।
শিক্ষামন্ত্রীর এই নাটকীয় এবং আকস্মিক পদত্যাগের পর নিট আন্দোলন সম্পূর্ণ নতুন কোনো মোড় নেবে কি না, এখন সমগ্র দেশবাসীর নজর সেদিকেই নিবদ্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অচলাবস্থা কাটানোর পর এবার দেশের চিকিৎসা শিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষার স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং পরীক্ষার্থীদের আস্থা অর্জনে সরকার কী ধরনের নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তা দেখার জন্য মুখিয়ে রয়েছে দেশের সচেতন মহল। আন্দোলনকারীরা সাময়িকভাবে তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জনে সফল হলেও, ভবিষ্যতে এই ধরনের কেলেঙ্কারির পুনরাবৃত্তি রোধ করতে দেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থায় এক সুদূরপ্রসারী কাঠামোগত সংস্কারের দাবি জোরালো হচ্ছে। দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার এই লড়াইয়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কেবল একটি সূচনা মাত্র, নাকি এর নেপথ্যে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক পটপরিবর্তন লুকিয়ে আছে, তা সময়ই বলে দেবে।


