প্রকাশ: ২৭ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশ বাহিনীর দীর্ঘদিনের জনবল ও যানবাহন সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। মন্ত্রিসভার ১৮ সদস্যের জন্য বরাদ্দ থাকা পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও কার্যকর ও বাস্তবসম্মত করতে এবং সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় ছয়জন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী এবং প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টার জন্য বিশেষ এসকর্ট সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে।
এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার হওয়া মন্ত্রীদের তালিকায় রয়েছেন সিলেটের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তারা হলেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। তবে বিশেষ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হলেও সরকারি বিধি অনুযায়ী তারা আগের মতোই ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য গানম্যান, বাসভবনে হাউস গার্ড এবং রাজধানীর বাইরে সরকারি সফরের সময় প্রয়োজনীয় পুলিশি নিরাপত্তা পাবেন।
সরকারি সূত্র এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত সপ্তাহ থেকে ধাপে ধাপে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা এবং প্রশাসনিক সূত্রও বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, সরকারের নির্দেশনা জারির পর থেকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট প্রত্যাহার শুরু হয় এবং বর্তমানে তা কার্যকর রয়েছে।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর রাজধানীতে চলাচলের সময় অধিকাংশ মন্ত্রী পুলিশের বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট সুবিধা ভোগ করে আসছিলেন। বর্তমানে মন্ত্রিসভায় ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী রয়েছেন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের মধ্যে অধিকাংশের বিশেষ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হলেও প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর আওতায় প্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নিজের নিরাপত্তা বহরের আকারও ছোট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভিআইপি নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যয় পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয় এবং পুলিশ সদর দপ্তরকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে। সরকারের মতে, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানো এবং সীমিত জনবলকে জনসাধারণের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এখন সময়ের দাবি।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, একজন মন্ত্রীর বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট দলে সাধারণত একজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং চারজন কনস্টেবল দায়িত্ব পালন করেন। তাদের জন্য একটি পৃথক পুলিশ পিকআপ ভ্যানও বরাদ্দ থাকে। এসব সদস্যের বেতন-ভাতা, যানবাহনের রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি ব্যয়সহ পুরো ব্যবস্থার অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকেই বহন করা হয়। ফলে একাধিক মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহার করলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকার যাদের জন্য বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট সুবিধা বহাল রেখেছে তারা হলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, মহিলা ও শিশুবিষয়কমন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, তাদের দায়িত্বের প্রকৃতি, নিরাপত্তাগত গুরুত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পরিবেশ, বন ও জলবায়ুবিষয়কমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী অ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইন, বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের জন্য বিশেষ প্রোটেকশন এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ডিএমপির সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাজধানী ঢাকায় ৪৯ জন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় ১ হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ প্রয়োজন রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৭৫ জন সদস্যের। অর্থাৎ প্রায় ৯০০ সদস্যের ঘাটতি বিদ্যমান। এই সংকটের কারণে দায়িত্বে থাকা সদস্যদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে, যার ফলে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু জনবল নয়, যানবাহনের সংকটও বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় দেশের বিভিন্ন এলাকায় থানা ও পুলিশ স্থাপনায় হামলার ঘটনায় প্রোটেকশন ইউনিটের বেশ কয়েকটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত ও পুড়ে যায়। সেই ক্ষতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। ফলে বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে একটি গাড়ি দিয়েই একাধিক ভিআইপির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে। এতে দায়িত্ব পালন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা কাঠামো সময়োপযোগীভাবে পুনর্বিন্যাস করা প্রয়োজন। তারা মনে করেন, যেসব দায়িত্ব পালনে বিশেষ এসকর্ট অপরিহার্য নয়, সেখানে সীমিত জনবলকে অন্য গুরুত্বপূর্ণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে নিয়োজিত করা হলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সেবাও আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় ব্যয় হ্রাস এবং জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যও বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সীমিত সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও বিশেষ এসকর্ট সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে, তবুও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের প্রয়োজনীয় সরকারি নিরাপত্তা অব্যাহত থাকবে বলে সরকার স্পষ্ট করেছে। ফলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুরোপুরি প্রত্যাহার নয়, বরং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


