জাতীয় কবি নজরুলের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের এই অনন্য প্রতিভার প্রয়াণ দিবসটি নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে স্মরণ করছে বাংলাদেশ। কবির বিদ্রোহ, মানবতা, সাম্য, প্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাণীকে সামনে রেখে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করছে।

১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে, যা বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত, শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর মৃত্যুর পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব এতটুকু ম্লান হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে তাঁর কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের কাছেও অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের শক্তি হিসেবে ফিরে আসে।

জাতীয় কবির মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কবি নজরুল ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে আজ ‘মৃত্যুঞ্জয়ী নজরুল’ শীর্ষক আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল ও হামদ-নাতের আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে নজরুলের জীবন, সাহিত্য ও দর্শন নিয়ে আলোচনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, কবিতা আবৃত্তি ও সংগীত পরিবেশনের আয়োজন করা হয়েছে। এসব কর্মসূচিতে কবির অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী আদর্শ নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কাজী নজরুল ইসলাম ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তাঁর ডাকনাম ছিল ‘দুখু মিয়া’। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া নজরুল ছোটবেলা থেকেই নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠেন। জীবনের শুরুতে কখনো মসজিদে মুয়াজ্জিনের কাজ, কখনো লেটো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকা, আবার কখনো বিভিন্ন পেশায় যুক্ত থেকে জীবন ও সমাজকে কাছ থেকে দেখেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও সংগীতের ভেতর গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়।

নজরুলের সৃষ্টিশীল জীবন ছিল তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের। মাত্র ২৩ বছরের সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নিজের স্বতন্ত্র প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। তাঁর কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস, নাটক ও প্রবন্ধ বাংলা ভাষার প্রচলিত সাহিত্যধারায় নতুন প্রাণ সঞ্চার করে। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন শোষণ, বঞ্চনা, অন্যায় ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে গভীর প্রেম, মানবিকতা, সৌন্দর্য ও সাম্যের আকাঙ্ক্ষা।

‘বিদ্রোহী’ কবিতার মাধ্যমে নজরুল বাংলা কবিতায় যে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন, তা আজও পাঠকের মনে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তাঁর বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্য, ধর্মীয় সংকীর্ণতা, জাতপাতের বিভেদ এবং সব ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর অবস্থান। এ কারণেই তিনি একই সঙ্গে প্রেমের কবি, বিদ্রোহের কবি, সাম্যের কবি এবং মানবতার কবি হিসেবে মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন।

নজরুলের সাহিত্যজগৎ ছিল বহুমাত্রিক। কবিতার পাশাপাশি তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, নাটক ও সাংবাদিকতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তাঁর সাংবাদিকতাও ছিল তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসন ও সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকাগুলোতে ব্রিটিশবিরোধী বক্তব্য ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে অবস্থান উঠে আসত। এ কারণে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছে।

সংগীতের জগতেও নজরুলের অবদান অসামান্য। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত গানগুলো ‘নজরুলগীতি’ নামে বাংলা সংগীতের একটি স্বতন্ত্র ধারায় পরিণত হয়েছে। প্রেম, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা, ইসলামী ভাবধারা, শ্যামাসংগীত, দেশাত্মবোধ এবং মানবিক অনুভূতি—বিভিন্ন বিষয় তাঁর গানে স্থান পেয়েছে। তিনি বাংলা গানে বহু নতুন রাগ, সুর ও ভাবের সংযোজন করেন। ফলে বাংলা সংগীতের পরিসরও তাঁর হাত ধরে আরও সমৃদ্ধ হয়।

নজরুলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর সৃষ্টির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও তিনি হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছেন। তাঁর কবিতা ও গানে ইসলামি ভাবধারার পাশাপাশি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য, শ্যামাসংগীত ও ভক্তিমূলক সংগীতের উপস্থিতি ছিল স্বাভাবিক ও সাবলীল। মানুষের পরিচয়কে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার এই দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে বাংলা সংস্কৃতিতে অনন্য মর্যাদা দিয়েছে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ও নজরুলের সাহিত্য ও সংগীত ছিল প্রেরণার অন্যতম উৎস। তাঁর দ্রোহ ও স্বাধীনতার চেতনা মুক্তিকামী মানুষের মনে শক্তি জুগিয়েছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয়ভাবে কবির সঙ্গে নিজেদের সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় করে।

১৯৭২ সালের ২৪ মে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ভারত সরকারের অনুমতি নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। তাঁকে বাংলাদেশের জাতীয় কবির মর্যাদা দেওয়া হয়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে তাঁকে বসবাসের জন্য একটি বাড়িও দেওয়া হয়। অসুস্থতার কারণে জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি সক্রিয়ভাবে সাহিত্যচর্চা করতে না পারলেও তাঁর সৃষ্টিকর্মের আবেদন অব্যাহত থাকে।

বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সমাবর্তনের মাধ্যমে তাঁকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। এর পর ১৯৭৬ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক নানা স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে তাঁর মর্যাদা আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

নজরুলের মৃত্যু কেবল একজন কবির জীবনের সমাপ্তি হলেও তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টির মৃত্যু হয়নি। তাঁর কবিতার বিদ্রোহ আজও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস জোগায়। তাঁর গান মানুষের হৃদয়ে প্রেম ও মানবতার অনুভূতি জাগায়। তাঁর সাম্যের দর্শন বৈষম্যহীন সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে শক্তিশালী করে। আর তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিভক্তির সময়ে মানুষকে সহাবস্থান ও সম্প্রীতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

পাঁচ দশক পরও তাই নজরুল কেবল স্মৃতির কবি নন; তিনি বর্তমানেরও কবি। সমাজে যখন বৈষম্য, সহিংসতা, অসহিষ্ণুতা কিংবা অন্যায়ের নানা রূপ দেখা দেয়, তখন তাঁর সৃষ্টির ভাষা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর জীবনসংগ্রামও মনে করিয়ে দেয়, প্রতিকূলতার মধ্য থেকেও সৃজনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ দিয়ে সমাজকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তাই আনুষ্ঠানিক স্মরণই শেষ কথা নয়। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তাঁর সাম্য, মানবতা ও অসাম্প্রদায়িকতার আদর্শকে সামাজিক জীবনে ধারণ করাই হতে পারে কবির প্রতি সবচেয়ে গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর সৃষ্টির শক্তিই প্রমাণ করে, একজন কবির জীবন থেমে যেতে পারে, কিন্তু সত্য, সাম্য ও মানবতার জন্য উচ্চারিত তাঁর কণ্ঠ সময়ের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

বাঁধনকে হেনস্তা: আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ বললেন উপদেষ্টা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানির ন্যায্য বণ্টনে ভারতের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘ অধিবেশনে আজ সভাপতির দায়িত্ব নেবেন খলিলুর রহমান

প্রকাশ:  ০৮ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

বাঁধনকে হেনস্তা: আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ বললেন উপদেষ্টা

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

পানির ন্যায্য বণ্টনে ভারতের প্রতি রাষ্ট্রপতির আহ্বান

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে প্রথম দিনে ২৫০ কোটি টাকা ফেরত

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাতিসংঘ অধিবেশনে আজ সভাপতির দায়িত্ব নেবেন খলিলুর রহমান

প্রকাশ:  ০৮ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট জেলা ক্রীড়া সংস্থার ৯ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভেনিসে হেনস্তার শিকার অভিনেত্রী বাঁধন, থানায় অভিযোগ

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আযাদের আপিল শুনানি চার সপ্তাহ মুলতবি

প্রকাশ:০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

দেশে ফেরার পথে সৌদিতে সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ প্রবাসী নিহত

প্রকাশ:  ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ