প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলায় টানা বৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও কালবৈশাখী ঝড় একসঙ্গে আঘাত হেনে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ঝড়ে ভেঙে পড়েছে অসংখ্য গাছ, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর ও বিদ্যুৎ লাইন, সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে সড়ক ও রেল যোগাযোগ। অন্যদিকে টানা বৃষ্টিপাত ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বহু পরিবার। একই সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকের স্বপ্নের বোরোধান ও সবজি ক্ষেত।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই সম্মিলিত আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ, কৃষক ও শিক্ষার্থীরা। সোমবার দিবাগত রাত থেকে শুরু হওয়া কালবৈশাখী ঝড় পুরো কমলগঞ্জ উপজেলাজুড়ে তাণ্ডব চালায়। প্রবল বাতাসে গাছ উপড়ে পড়ে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বহু এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্ভোগে পড়েন সাধারণ মানুষ।
উপজেলার শমশেরনগর, পতনঊষার ও মুন্সিবাজার ইউনিয়নে অন্তত অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে। অনেকের টিনের চাল উড়ে গেছে, কোথাও গাছ ভেঙে ঘরের ওপর পড়ে বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাতভর আতঙ্কে কাটিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
ঝড়ের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকার ভেতরে বড় গাছ ভেঙে পড়ায় ভানুগাছ-শ্রীমঙ্গল সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সোমবার ভোর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত ওই সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। এতে দুর্ভোগে পড়েন শত শত যাত্রী।
একই সময় শমশেরনগর বিমান বাহিনী ইউনিট সংলগ্ন এলাকায় রেললাইনের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ট্রেন চলাচল সাময়িক বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকাগামী কালনী এক্সপ্রেস প্রায় ৪০ মিনিট লংলা স্টেশনে আটকা পড়ে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন ট্রেনযাত্রীরা।
শমশেরনগর রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার রজত কুমার বলেন, ঝড়ের কারণে রেললাইনের ওপর গাছ পড়ে যাওয়ায় ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পরে দ্রুত উদ্ধার কাজ চালিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয়।
বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে এসএসসি পরীক্ষার্থীদেরও দুর্ভোগে পড়তে হয়। মুন্সিবাজার এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রে বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকার পরিবেশে পরীক্ষা দিতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। গরম, আলো সংকট ও অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে উৎকণ্ঠা দেখা দেয়।
মুন্সিবাজার কালিপ্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সত্যেন্দ্র কুমার পাল বলেন, ঝড়ে বিদ্যুৎ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ছিল। এতে পরীক্ষার্থীরা কিছুটা সমস্যার মুখোমুখি হয়।
অন্যদিকে টানা দু’দিনের ভারী বর্ষণ ও ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কমলগঞ্জের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। মুন্সিবাজার ও পতনঊষার ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। ধলাই, লাঘাটা নদীসহ বিভিন্ন পাহাড়ি ছড়ার পানি দ্রুত বাড়ছে। স্থানীয়দের মধ্যে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ জানান, ধলাই নদীর পানি বিপৎসীমার দেড় ফুট নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, ঝড় ও ভারী বৃষ্টিপাতে নিম্নাঞ্চলে কিছু বোরোধান নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া গাছপালা পড়ে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হলেও তা দ্রুত স্বাভাবিক করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে পানি দ্রুত নেমে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তবে কৃষকদের মধ্যে সেই আশার চেয়ে শঙ্কাই বেশি। কারণ ধান কাটার মৌসুমে হঠাৎ বন্যা ও জলাবদ্ধতায় তাদের বছরের পরিশ্রম পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। উপজেলার পতনঊষার ইউনিয়নের কেওলার হাওর এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় আধাপাকা বোরোধান পানির নিচে তলিয়ে আছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। অনেকেই আবার শেষ মুহূর্তে ধান ঘরে তুলতে না পেরে হতাশ হয়ে পড়েছেন।
কেওলার হাওরের কৃষক আনোয়ার খান বলেন, “দু’দিনের বৃষ্টিতে সব শেষ হওয়ার উপক্রম। ধান পাকছিল, আর কয়েকদিন সময় পেলেই ঘরে তুলতে পারতাম। এখন পানির নিচে চলে গেছে। যারা ঋণ করে চাষ করেছে, তারা কীভাবে ঋণ শোধ করবে?”
তিনি আরও বলেন, শুধু ধান নয়, অনেক এলাকার সবজি ক্ষেতও তলিয়ে গেছে। দীর্ঘসময় পানি জমে থাকলে কৃষকদের বড় ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কমলগঞ্জে প্রায় পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে বোরোধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ হেক্টর জমির ধান পুরোপুরি নিমজ্জিত হয়েছে এবং ৩৫০ হেক্টর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবজি ক্ষেতের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনো সংগ্রহ করা হয়নি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার রায় বলেন, যদি দ্রুত পানি নেমে যায়, তাহলে ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কম হতে পারে। তবে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এ অঞ্চলে ১৮৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েকদিন আরও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ।
স্থানীয়দের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কালবৈশাখী ঝড়, অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক পাহাড়ি ঢলের প্রবণতা বেড়েছে। এতে হাওর ও সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছেন। কৃষি, যোগাযোগ, শিক্ষা ও জনজীবনের ওপর এর বিরূপ প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
কমলগঞ্জের মানুষ এখন আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রার্থনা করছেন—বৃষ্টি যেন দ্রুত থামে এবং পানি নেমে যায়। কারণ আর কয়েকদিন এ অবস্থা চললে শুধু ফসল নয়, হাজারো পরিবারের জীবিকা ও ভবিষ্যৎও বড় সংকটে পড়ে যাবে।


