প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনের এক আলোচিত ও বেদনাবিধুর অধ্যায় বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর গুমের ১৪ বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে রাজধানী ঢাকার বনানী এলাকা থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তার ভাগ্য সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। এই ঘটনায় পরিবার, রাজনৈতিক সহকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে আজও গভীর প্রশ্ন ও উদ্বেগ রয়ে গেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম এক ব্রিফিংয়ে জানান, ইলিয়াস আলীর গুমের রহস্য উদঘাটনে তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত এগোচ্ছে এবং তারা আশাবাদী যে খুব শিগগিরই এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট প্রতিবেদন পাওয়া যাবে। তিনি বলেন, তদন্তে বিভিন্ন সময়ের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর), সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা চলছে।
চিফ প্রসিকিউটর আরও উল্লেখ করেন, তদন্তকারীরা ২০১২ সালের এপ্রিল মাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করছেন, যেখানে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার আগে ও পরে একই সময়পর্বে আরও কয়েকটি অপহরণের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনার মধ্যে সম্ভাব্য সংযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তিনি দাবি করেন, কিছু টেলিফোন রেকর্ড ও যোগাযোগ বিশ্লেষণে সন্দেহজনক কিছু তথ্য পাওয়া গেছে, যা তদন্তকে নতুন দিক নির্দেশনা দিতে পারে।
তিনি আরও জানান, বিভিন্ন মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ থেকে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় পরোক্ষ কিছু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যা তদন্তের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি তৎকালীন সময়ের কয়েকজন উচ্চপদস্থ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার কাছ থেকেও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে এসব তথ্য এখনো যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি স্পষ্ট করেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, তদন্তের স্বার্থে সব তথ্য এখনই প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে পরিবার, সহকর্মী এবং ঘটনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সাক্ষ্য নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যেতে পারে এবং তা জাতির সামনে উপস্থাপন করা সম্ভব হবে।
অন্যদিকে, ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের ঘটনা ঘিরে বিভিন্ন সময় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ও অভিযোগ উঠে এসেছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৎকালীন সময়ের নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য এবং প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি এখনো স্বাধীনভাবে ও আনুষ্ঠানিকভাবে আদালত কর্তৃক প্রমাণিত হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মিডিয়া রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে যে, তৎকালীন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তাদের জিজ্ঞাসাবাদে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনার বিষয়ে কিছু তথ্য উঠে এসেছে। এসব প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কিছু সদস্যের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এসব বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিলের মধ্যরাতে বা ১৮ এপ্রিলের প্রথম প্রহরে বিএনপির তৎকালীন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এবং সিলেট জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এম ইলিয়াস আলী রাজধানীর বনানী এলাকা থেকে নিখোঁজ হন। তার সঙ্গে থাকা গাড়িচালক আনসার আলীও সেই সময় থেকে নিখোঁজ রয়েছেন। ঘটনার পরপরই বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এর আগে একই বছরের এপ্রিলের শুরুতে সিলেটের দুই ছাত্রদল নেতা নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাকে ঘিরে সেই আগের ঘটনাগুলোর সঙ্গে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়েও বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। তদন্ত সংস্থাগুলো তখন থেকেই বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ইলিয়াস আলীর পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে তার ফিরে আসার আশায় দিন কাটাচ্ছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আশা যেমন ক্ষীণ হয়েছে, তেমনি বিচার ও সত্য উদঘাটনের দাবি আরও জোরালো হয়েছে। পরিবার ও রাজনৈতিক সহকর্মীরা বারবার দাবি জানিয়ে আসছেন, ঘটনাটির নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা হোক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় পার হলেও এটি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ও বিতর্ক এখনো শেষ হয়নি। তারা মনে করেন, একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টদের বরাতে জানা গেছে, বর্তমান তদন্ত প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। পুরনো নথি, কল রেকর্ড, সাক্ষ্য এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য পুনরায় বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তদন্ত কর্মকর্তারা আশা করছেন, নতুন প্রযুক্তি ও তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে, ১৪ বছর পরও এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘিরে রহস্যের জট পুরোপুরি খোলেনি। তবে সাম্প্রতিক তদন্ত অগ্রগতির দাবি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পরিবার, রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা একটাই—একটি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদঘাটিত হোক এবং দীর্ঘদিনের এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটুক।


