প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দেশে নতুন করে কোনো যৌথ অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত কার্যক্রম নিয়মিতভাবেই পরিচালিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিবেচনায় এসব সমন্বিত কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণের শুভারম্ভ ফলক উন্মোচন শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও তাঁর বক্তব্যের বিভিন্ন দিক জানানো হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বাহিনীগুলোর দায়িত্ব পালন, আনসারের নতুন সদর দপ্তর এবং রাজধানীর যানজট নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ, বিজিবি, এসআরবি ও আনসারের মধ্যে সমন্বয় করে অপরাধ দমন বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কার্যক্রমকে নতুন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা হিসেবে দেখা হচ্ছে না। এসব বাহিনী নিজেদের দায়িত্বের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী সমন্বিতভাবে কাজ করে থাকে। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে পরিচালিত কার্যক্রমের ক্ষেত্রে এই সমন্বয় ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। তবে আলাদা করে নতুন কোনো যৌথ অভিযান পরিচালনার আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের বিষয়েও কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে শুধু তাকে দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করেই বিষয়টি শেষ করা হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে যথাযথ বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। অপরাধের ধরন ও প্রমাণের ভিত্তিতে ‘ক্রিমিনাল অফেন্স’ মামলাও করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহির বিষয়টি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাহিনীর কোনো সদস্য দায়িত্বে অবহেলা করলে বা ক্ষমতার অপব্যবহারে জড়িয়ে পড়লে তার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের অবস্থানের অংশ বলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়েছে ধরে না নিয়ে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রয়োজনীয়তাও রয়েছে।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে ডিসেম্বর মাসের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয়ের মাস এবং এ মাসে কোনো অপশক্তিকে দেশে অস্থিরতা তৈরির সুযোগ দেওয়া হবে না। তাঁর বক্তব্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। তবে এ ধরনের নিরাপত্তামূলক কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইন, মানবাধিকার ও নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার বিষয়গুলোও সমানভাবে বিবেচনায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সংবাদ সম্মেলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর নতুন সদর দপ্তর নির্মাণ। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, একটি পরিকল্পিত ও উপযুক্ত স্থানে আনসার ও ভিডিপির নিজস্ব সদর দপ্তর স্থাপনের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হতে যাচ্ছে। নতুন সদর দপ্তরের জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তিন একরের বেশি জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সেখানে আধুনিক ও বড় পরিসরের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।
বর্তমানে আনসার ও ভিডিপির সদর দপ্তরের জায়গা ও অবকাঠামোগত সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ধরনের সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়ে আসছে। নতুন স্থানে আধুনিক সদর দপ্তর নির্মিত হলে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা, সদস্যদের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা এবং বাহিনীর সাংগঠনিক কার্যক্রমে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বাহিনীর অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জনবল ও ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন। নিয়মিত ও অনিয়মিত সদস্য মিলিয়ে আনসারকে দেশের বৃহৎ বাহিনী হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বিভিন্ন জাতীয় সংকট ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব পালনের প্রশংসা করেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন জাতীয় সংকটের সময় বাহিনীর অবদানের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি আনসার সদস্যদের আর্থিক ও অন্যান্য পর্যায়ক্রমিক দাবি পূরণের বিষয়ে সরকারের আশ্বাসের কথা জানান।
কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব পালনকারী আনসার সদস্যদের আবাসনসংকটের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ সমস্যা মোকাবিলায় ডরমিটরি ও ব্যারাকের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি ঢাকার আশুলিয়া ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। বিপুলসংখ্যক সদস্যের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে তাদের আবাসন ও কল্যাণমূলক সুবিধা সরাসরি সম্পর্কিত হওয়ায় এ ধরনের অবকাঠামো উন্নয়ন বাহিনীর কার্যক্ষমতা ও সদস্যদের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা বাড়াতে অটোমেশন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ট্রাফিক আইন প্রয়োগে মানবিক হস্তক্ষেপ কমানো এবং প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে বিভিন্ন সড়কে একসঙ্গে খনন ও নির্মাণকাজ চলার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, রাস্তা খনন বা নির্মাণের সময় পুরো সড়ক একসঙ্গে কেটে ফেলার পরিবর্তে খণ্ড খণ্ডভাবে কাজ শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কাজ শেষ হওয়ার পর দ্রুত রাস্তা পুনর্নির্মাণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নগরবাসীর দৈনন্দিন চলাচলে নির্মাণকাজের প্রভাব কমাতে এ ধরনের সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
রাজধানীর সড়কে যানজট শুধু কর্মজীবী মানুষের সময় নষ্ট করে না, এর প্রভাব পড়ে শিক্ষার্থী, রোগী, ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর। ফলে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সড়ক উন্নয়নকাজে সমন্বয় বাড়ানোর উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর দৈনন্দিন ভোগান্তি কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে এর সঠিক ব্যবহার, রক্ষণাবেক্ষণ এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ওপর।
সামগ্রিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক যৌথ অভিযান না থাকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে, অন্যদিকে চলমান সমন্বিত আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম আরও জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের জবাবদিহি, আনসারের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও সরকারের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইনের যথাযথ প্রয়োগ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিক নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হলে জনসাধারণের আস্থা আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ থাকবে।

