হবিগঞ্জ-সিলেট রুটে অনির্দিষ্টকালের বাস ধর্মঘট

প্রকাশ:০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বাস মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে হবিগঞ্জ-সিলেট রুটে অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার ১ অক্টোবর ভোর থেকে হবিগঞ্জের অভ্যন্তরীণ রুটসহ জেলার দূরপাল্লার সব গণপরিবহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। আকস্মিকভাবে বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন সাধারণ যাত্রী, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, রোগী ও ব্যবসায়ীরা। গুরুত্বপূর্ণ এই আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা বন্ধ থাকায় সিলেট ও হবিগঞ্জের পাশাপাশি মৌলভীবাজারের বিভিন্ন এলাকার মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতও ব্যাহত হচ্ছে।

হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের ডাকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে জেলার বিভিন্ন যানবাহন মালিক-শ্রমিক সমিতি ও সংশ্লিষ্ট নেতারা একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। বুধবার মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে হবিগঞ্জের তিনটি বাস আটকে রাখার প্রতিবাদে ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন হবিগঞ্জের পরিবহন মালিকদের নেতারা। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হলেও নির্ধারিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরও বারবার বাস আটকের ঘটনা ঘটছে। ফলে স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল জানিয়েছেন, হবিগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল-মৌলভীবাজার-শেরপুর-সিলেট রুটে বাস চলাচল নিয়ে দুই জেলার মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। বিভিন্ন সময়ে প্রশাসন ও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের উদ্যোগে বৈঠক করে সমস্যার সমাধান করা হলেও কিছুদিন পর আবারও বিরোধ দেখা দেয়। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল এলাকায় হবিগঞ্জের বাস থামানো, কাউন্টার ও যাত্রী ওঠানামাকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তীব্র হয়েছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

আবু মঈন চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১২ জুন সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি সভায় হবিগঞ্জ-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার রুটে আগের নিয়মে বাস চলাচলের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে শ্রীমঙ্গলে হবিগঞ্জের বাস কোনো নির্ধারিত স্টপেজ দিতে পারবে না—এমন শর্তও রাখা হয়েছিল। পরিবহন মালিকদের দাবি, ওই সিদ্ধান্ত মেনে কিছুদিন বাস চলাচল স্বাভাবিক ছিল।

এরপর গত ১১ সেপ্টেম্বর মৌলভীবাজারের এসএমএস মালিক-শ্রমিকদের পক্ষ থেকে হবিগঞ্জের ২২টি বাস আটকে রাখার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে আবারও উত্তেজনা তৈরি হলে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ১২ জুনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হবিগঞ্জ-সিলেট ভায়া মৌলভীবাজার রুটে বাস চলাচল অব্যাহত রাখার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলে হবিগঞ্জের পরিবহন নেতারা জানান। বৈঠকের পর আগে আটকে রাখা বাসগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।

তবে বিরোধ সেখানেই শেষ হয়নি। হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর সকালে ওই রুটে বাস চলাচল পুনরায় শুরু করার পর মৌলভীবাজারের এসএমএস কর্তৃপক্ষ হবিগঞ্জের তিনটি বাস আটকে রাখে। তার দাবি, এসব বাস এখনো ছেড়ে দেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

হবিগঞ্জের পরিবহন নেতাদের বক্তব্য, তারা কোনো পক্ষের সঙ্গে সংঘাত চান না। পূর্বে নেওয়া প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাস চলাচলের নিশ্চয়তা চান তারা। আবু মঈন চৌধুরীর ভাষ্য, হবিগঞ্জের বাসগুলোকে নির্ধারিত নিয়মের মধ্যে নির্বিঘ্নে চলাচলের সুযোগ দিতে হবে। সমস্যার স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট প্রত্যাহারের বিষয়ে তারা ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না বলেও তিনি জানিয়েছেন।

অন্যদিকে হবিগঞ্জের পরিবহন মালিকদের অভিযোগের সঙ্গে একমত নন মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং এসএমএস বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম রিপন। তিনি দাবি করেছেন, বিষয়টি সমাধানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর মধ্যেই শ্রীমঙ্গলে এসএমএস পরিবহনের কাউন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। তার অভিযোগ, হবিগঞ্জ মোটর মালিক গ্রুপের লোকজন ওই হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

আব্দুর রহিম রিপনের দাবি, হামলার ঘটনায় কয়েকজন শ্রমিক আহত হয়েছেন এবং তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে একজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় থানায় মামলা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে হামলার অভিযোগ হবিগঞ্জের পরিবহন নেতাদের পক্ষ থেকে কীভাবে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়ার কথা।

এসএমএস বাস মালিক সমিতির সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী, শ্রীমঙ্গলের শ্রমিকরাই হবিগঞ্জের বাসগুলো আটকে রেখেছেন। এর সঙ্গে সংগঠনের নেতৃত্বের সরাসরি সিদ্ধান্তের বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেছেন। তার মতে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে হলে দুই পক্ষকে নিয়ে বসে আলোচনা করতে হবে। একই সঙ্গে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনারও সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছেন।

দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। হবিগঞ্জ থেকে সিলেট, মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলগামী এবং এসব এলাকা থেকে হবিগঞ্জমুখী বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন বাসের ওপর নির্ভর করেন। চাকরি, ব্যবসা, শিক্ষা, চিকিৎসা কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে প্রতিদিন এই রুটে যাতায়াত করা মানুষের জন্য বাস চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া বড় ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করেছে।

বিশেষ করে দূরপাল্লার যাত্রীদের পাশাপাশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ বেশি সমস্যায় পড়ছেন। বিকল্প যানবাহন পাওয়া গেলেও অনেক ক্ষেত্রে ভাড়া বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। আবার অতিরিক্ত যাত্রী চাপের কারণে বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থাতেও ভোগান্তি তৈরি হতে পারে। রোগী ও তাদের স্বজনদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে, কারণ জরুরি প্রয়োজনে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাওয়ার ক্ষেত্রে সময়মতো পরিবহন পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

পরিবহন খাতের এই বিরোধ দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব শুধু বাস মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। দীর্ঘ সময় ধর্মঘট চললে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণ, কর্মস্থলে যাতায়াত এবং আন্তজেলা যোগাযোগব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে দুই জেলার পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়লে নতুন করে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন সংগঠনগুলোর দ্রুত উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে যেসব বৈঠকের মাধ্যমে সমঝোতা হয়েছিল, সেসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে এবং কোথায় সমন্বয়ের ঘাটতি ছিল, তা পর্যালোচনা করে একটি স্পষ্ট ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে হামলা, ভাঙচুর বা বাস আটকে রাখার অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায় নির্ধারণ করাও জরুরি।

হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের বিরোধের স্থায়ী সমাধান না হলে একই ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও ফিরে আসতে পারে। তাই বাস চলাচলের নিয়ম, স্টপেজ, কাউন্টার পরিচালনা এবং যাত্রী পরিবহনের বিষয়ে দুই পক্ষের জন্য গ্রহণযোগ্য ও লিখিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি যাত্রীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত গণপরিবহন চালু করার উদ্যোগ নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

ধর্মঘট কতদিন চলবে এবং আলোচনার মাধ্যমে কবে পরিস্থিতির সমাধান হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা জানানো হয়নি। দুই পক্ষের অবস্থান আপাতত ভিন্ন হলেও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির সুযোগ রয়েছে। সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের এই বিরোধ আর নতুন করে তাদের দৈনন্দিন জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে না ফেলে দ্রুত সমাধানের পথে এগিয়ে যাবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়নি, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইবার মামলায় শ্রীমঙ্গলে জুলাই রাজবন্দি অ্যালায়েন্স নেতা আটক

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী সফর, একাধিক কর্মসূচি

প্রকাশ:০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

শেওলা বন্দরে আবারও কয়লা-পাথর আমদানি শুরু

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সার পরিবহনের দরপত্রে কেউ নেই, উঠল হুমকির অভিযোগ

প্রকাশ:০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

বিষয়বস্তু

যৌথ অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়নি, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সাইবার মামলায় শ্রীমঙ্গলে জুলাই রাজবন্দি অ্যালায়েন্স নেতা আটক

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ফেনীতে প্রধানমন্ত্রীর দিনব্যাপী সফর, একাধিক কর্মসূচি

প্রকাশ:০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

শেওলা বন্দরে আবারও কয়লা-পাথর আমদানি শুরু

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সার পরিবহনের দরপত্রে কেউ নেই, উঠল হুমকির অভিযোগ

প্রকাশ:০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

ঢাকায় বিএনপির তিন কমিটি বিলুপ্ত, বহিষ্কার ১৪ নেতা

প্রকাশ: ০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

টানা তিন দফা কমার পর আবার বাড়ল স্বর্ণের দাম

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ