প্রকাশ:০১ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দিনব্যাপী সরকারি সফরে ফেনীতে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে তিনি ফেনীতে পৌঁছান। এরপর তাঁর গাড়িবহর জেলার পরশুরামের উদ্দেশে রওনা হয়। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি নিষ্কাশন ও সেচব্যবস্থা উন্নয়নের একটি বড় প্রকল্প উদ্বোধন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন এবং ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড বিতরণসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু জানান, বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১টার দিকে প্রধানমন্ত্রী ফেনীতে পৌঁছান। এর আগে সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে তিনি সড়কপথে রাজধানীর গুলশানের বাসভবন থেকে পরশুরামের উদ্দেশে যাত্রা করেন। ফেনীতে নির্ধারিত কর্মসূচি শেষ করে সন্ধ্যায় তাঁর ঢাকায় ফেরার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলায় প্রশাসনিক প্রস্তুতির পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
ফেনী সফরের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীর পরশুরাম উপজেলার ঘাটঘর-মুহুরী ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্প পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পের উদ্বোধন করার কর্মসূচি রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ফেনীর বিভিন্ন এলাকায় বর্ষা ও অতিবৃষ্টির সময় বন্যা, জলাবদ্ধতা এবং নদীভাঙনের যে সমস্যা তৈরি হয়, তা মোকাবিলায় প্রকল্পটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুহুরী ও কহুয়া নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষের জন্য নদী ও পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন তাদের জীবনযাত্রা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
সরকারি অনুমোদন অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় ৬৭ দশমিক ৯২ কিলোমিটার বাঁধ পুনর্বাসন, ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ, ৮৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নদী ও জলাধার পুনঃখনন, ২৭টি সেচ অবকাঠামো পুনর্বাসন এবং ৭৭টি ইনলেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব কাজ বাস্তবায়িত হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষিজমিতে সেচসুবিধা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রকল্পের পরবর্তী পর্যায়েও মুহুরী ও কহুয়া নদীতে নতুন বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি সিলোনিয়া নদীতেও বাঁধ নির্মাণ, নদী খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার কথা রয়েছে। প্রকল্পের কাজ ২০৩০ সালের মধ্যে শেষ করার সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বড় ধরনের অবকাঠামো প্রকল্পের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে নির্মাণের গুণগত মান, অর্থের সঠিক ব্যবহার, পরিবেশগত বিষয় এবং নিয়মিত তদারকির ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ফেনীর দক্ষিণ ও সীমান্তবর্তী এলাকার অনেক মানুষের জীবিকা কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, বাঁধের দুর্বলতা কিংবা পানি দ্রুত নিষ্কাশিত না হওয়ার কারণে কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এর প্রভাব শুধু কৃষকের ওপর পড়ে না, স্থানীয় বাজার, পরিবহন, শ্রমজীবী মানুষ এবং সামগ্রিক গ্রামীণ অর্থনীতিতেও তা ছড়িয়ে পড়ে। তাই বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর উন্নয়ন স্থানীয় মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব বহন করে।
প্রকল্প উদ্বোধনের পর প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় জনগণের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করার কথা রয়েছে। এরপর তিনি ফুলগাজী উপজেলার বেগম খালেদা জিয়া মহিলা কলেজে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে অংশ নেবেন। একটি সরকারি সফরের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি পরিবেশ ও জলবায়ু সংশ্লিষ্ট সচেতনতার বিষয়টিও এই কর্মসূচির মাধ্যমে তুলে ধরা হবে। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে সবুজায়ন বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক পরিবেশ সচেতনতা তৈরির সুযোগ রয়েছে।
ফুলগাজী জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয়ও প্রধানমন্ত্রীর একটি কর্মসূচি রয়েছে। সেখানে তিনি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া উপজেলার সরকারি ভবনগুলোতে মোট ৯৬২ দশমিক ৫ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ছাগলনাইয়ায় ৪১৫ কিলোওয়াট, পরশুরামে ২৯৮ কিলোওয়াট এবং ফুলগাজীতে ২৪৯ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে।
সরকারি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের এই উদ্যোগ নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে। উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হলে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুধু সংশ্লিষ্ট ভবনের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বৃহত্তর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গেও যুক্ত হবে। একই সঙ্গে সরকারি স্থাপনাগুলোতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়লে ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে ফুলগাজী সরকারি পাইলট হাইস্কুল মাঠে। সেখানে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সম্মানী প্রদান কার্যক্রমে অংশ নেবেন তিনি। স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নিরাপত্তা, কৃষি সহায়তা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবে এ কর্মসূচিকে দেখা হচ্ছে।
ফুলগাজীতে মোট ৫১০ জন ফ্যামিলি কার্ড পাবেন। একই সঙ্গে পুরো ফেনী জেলায় ৭ হাজার ৬৪৩ জন কৃষক কৃষক কার্ডের আওতায় আসবেন। এছাড়া ফুলগাজী উপজেলার ২৩৮ জন ইমাম, মুয়াজ্জিন, খাদেম ও পুরোহিতকে সম্মানী দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে। কৃষক কার্ড কার্যক্রমের আওতায় কৃষকদের বিভিন্ন সরকারি সেবা ও সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ফলে কার্ড বিতরণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এর মাধ্যমে কৃষকদের কাছে সেবা ও প্রণোদনা পৌঁছানোর কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে পরিচালিত হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
ফেনীর মানুষের কাছে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের আরেকটি আবেগীয় দিকও রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নানা এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের গ্রামের বাড়ি ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার শ্রীপুরে। একই জেলার ফেনী-১ আসনের সঙ্গে খালেদা জিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে। ফলে সরকারি কর্মসূচির বাইরে প্রধানমন্ত্রীর পারিবারিক সম্পর্কের কারণে ফেনীর প্রতি তাঁর সফরকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহও রয়েছে।
তবে সফরের মূল গুরুত্ব সরকারি উন্নয়ন ও জনসেবা কার্যক্রমের মধ্যেই রয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও পানি নিষ্কাশন প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে। একইভাবে সৌরবিদ্যুৎ, কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের মতো উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সঠিক উপকারভোগী নির্বাচন এবং নিয়মিত তদারকি কার্যকর ফল পাওয়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এক দিনের সফরে পরশুরাম ও ফুলগাজীর একাধিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। এতে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন দিক একসঙ্গে উঠে আসছে। এখন এসব কর্মসূচির ঘোষিত লক্ষ্য ও প্রকল্পগুলো কতটা সময়মতো এবং কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, তার ওপরই স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশার বাস্তব প্রতিফলন অনেকাংশে নির্ভর করবে। প্রধানমন্ত্রীর সফর শেষে সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও প্রশাসনের ধারাবাহিক কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোর বাস্তব অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।


