প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী, স্থিতিশীল ও জনকল্যাণমুখী করতে অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিশেষ করে গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য বণ্টন এবং পানি ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সহযোগিতার জন্য ভারতের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার সকালে বঙ্গভবনে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, বাণিজ্য, যোগাযোগ, পানি সম্পদ, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরও টেকসই করতে হলে শুধু রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা বিষয়গুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। তাঁর মতে, পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো ন্যায়সঙ্গত ও উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্যভাবে সমাধান করা গেলে বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাস আরও গভীর হবে।
অভিন্ন নদীর পানি বাংলাদেশের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি গঙ্গা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদ-নদীর পানির ন্যায্য বণ্টনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহু অভিন্ন নদী থাকলেও সেগুলোর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে পানি ইস্যু দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।
বৈঠকে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এ বিষয়ে তাঁর সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে রাষ্ট্রপতিকে জানান। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের সম্পর্ক আরও উন্নত করার বিষয়ে ভারতের আগ্রহের কথাও তুলে ধরেন।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের বিভিন্ন পর্যায়ের রাজনৈতিক ও সরকারি ব্যক্তিদের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বৈঠক করছেন। এসব আলোচনায় দুই দেশের সম্পর্ককে জনগণকেন্দ্রিক করার প্রয়োজনীয়তা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যোগাযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
এর আগে বিভিন্ন আলোচনায় ভারতীয় হাইকমিশনার দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর বক্তব্যে দুই দেশের অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভৌগোলিক নৈকট্য এবং পারস্পরিক নির্ভরতার বিষয়ও উঠে এসেছে। ফলে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে মঙ্গলবারের বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ধারাবাহিক যোগাযোগের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
বঙ্গভবনের বৈঠকে রাষ্ট্রপতি বলেন, নিকটতম প্রতিবেশী এবং গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশের কাছে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে সার্বভৌম সমতা, জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং দুই দেশের জনগণের কল্যাণ।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে এমন একটি সম্মানজনক ও ভবিষ্যতমুখী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে আগ্রহী, যেখানে দুই দেশের সার্বভৌম সমতা ও জাতীয় মর্যাদা বজায় থাকবে এবং উভয় দেশের জনগণ এর সুফল পাবে।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, পর্যটন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ এবং সীমান্তবর্তী মানুষের দৈনন্দিন জীবন নানা ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে দুই দেশের সম্পর্কের কোনো টানাপোড়েন বা অমীমাংসিত বিষয় সাধারণ মানুষের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে অভিন্ন নদীর পানি নিয়ে আলোচনার গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গভীর। দেশের কৃষি, মৎস্য, নদীনির্ভর জীবিকা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা পানির প্রবাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে কৃষি ও পরিবেশের ওপর চাপ তৈরি হয়। আবার বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানি ও নদীর প্রবাহের পরিবর্তন ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। তাই অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা কেবল কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গেও নিবিড়ভাবে যুক্ত।
তিস্তা পানি বণ্টন ইস্যু বিশেষভাবে আলোচিত একটি বিষয়। দীর্ঘ সময় ধরে এ নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আলোচনা হলেও চূড়ান্ত সমাধান হয়নি। বাংলাদেশ বহুবার তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা এবং একটি কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিয়ে ভারতের সঙ্গে আলোচনা করেছে। একইভাবে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি রয়েছে, তবে পানি ব্যবস্থাপনা ও নদীর সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির বক্তব্যে এসব বাস্তবতারই প্রতিফলন দেখা গেছে। তিনি অমীমাংসিত বিষয়গুলোকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের ওপর জোর দিয়েছেন। এতে বোঝা যায়, বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এগিয়ে নিতে সংঘাত বা মুখোমুখি অবস্থানের পরিবর্তে আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার পথকেই গুরুত্ব দিতে চায়।
বৈঠকে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও গুরুত্ব পেয়েছে। রাষ্ট্রপতি বলেন, বাণিজ্য, পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের বিপুল জনসংখ্যা ও বাজারকে বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করা গেলে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও ভারতের সহযোগিতার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথের পাশাপাশি আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল আরও সহজ করার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা বাড়ানো গেলে সম্পর্কের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান এবং তাঁর সফল কর্মকাল কামনা করেন। তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ভারত অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় বলে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্কসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণে ভারতের আগ্রহের কথা জানান।
হাইকমিশনার বলেন, পারস্পরিক মর্যাদা, আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় ও উন্নত করতে ভারত আগ্রহী। দুই দেশের মানুষের মধ্যে ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে উল্লেখ করে তিনি এই সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
রাষ্ট্রপতি ভারতীয় হাইকমিশনারের শুভেচ্ছার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান এবং ভারতের রাষ্ট্রপতির প্রতি তাঁর আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও শুভেচ্ছা পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, হাইকমিশনারের দায়িত্বকাল দুই দেশের সম্পর্ককে আরও ইতিবাচক, ফলপ্রসূ ও জনকল্যাণমুখী করতে ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, দুই পক্ষই সম্পর্ককে ভবিষ্যতমুখী করার বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বাস্তবতা, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য এবং জনগণের যোগাযোগের মতো বিভিন্ন বিষয় নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং খোলামেলা আলোচনা অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধানের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতির আহ্বানের মূল বার্তাটি হলো, প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্ককে শুধু অতীতের বন্ধুত্ব বা ঐতিহাসিক যোগাযোগের ওপর নির্ভর না রেখে বাস্তব স্বার্থ ও মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী করা। বিশেষ করে পানি বণ্টনের মতো জীবনঘনিষ্ঠ বিষয়ে ন্যায়সঙ্গত সমাধান হলে সীমান্তের দুই পাশের মানুষের মধ্যেও আস্থা বাড়তে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনেকাংশেই নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান ও বাস্তব সহযোগিতার ওপর। অমীমাংসিত বিষয়গুলো আলোচনার টেবিলে রেখে ধাপে ধাপে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা গেলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। আর সেই সম্পর্কের সুফল যদি সাধারণ মানুষের জীবন, জীবিকা, বাণিজ্য ও উন্নয়নে দৃশ্যমান হয়, তাহলে প্রতিবেশী দুই দেশের অংশীদারিত্ব আরও অর্থবহ হয়ে উঠবে।
মঙ্গলবার বঙ্গভবনের বৈঠক সেই বৃহত্তর সম্ভাবনার কথাই সামনে এনেছে। একদিকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পানির ন্যায্য বণ্টনসহ অমীমাংসিত ইস্যু দ্রুত সমাধানের প্রত্যাশা জানানো হয়েছে, অন্যদিকে ভারতও সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এখন এই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাস্তব অগ্রগতিতে কতটা রূপ নেয়, সেটিই হবে আগামী দিনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


