প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আজ দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে তিনি এক বছরের জন্য এ দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পদে একজন বাংলাদেশির দায়িত্ব গ্রহণ দেশের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমান আগামী এক বছর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রতিনিধিত্ব থাকা এই ফোরামে বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকট, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। ফলে সভাপতির দায়িত্ব কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদ নয়; বরং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপ ও সমঝোতার পরিবেশ তৈরির ক্ষেত্রেও এটি গুরুত্বপূর্ণ।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নতুন অধিবেশনের উদ্বোধনী কার্যক্রমকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিকরা সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নেন। অধিবেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নানা সংকট নিয়ে আলোচনা হয় এবং সদস্য দেশগুলো নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।
এমন একটি সময়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব নিচ্ছেন, যখন বিশ্বজুড়ে একাধিক সংকট আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত, নিরাপত্তা সংকট, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা জাতিসংঘের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। এসব ইস্যুতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য যেমন রয়েছে, তেমনি সমাধানের জন্য বহুপাক্ষিক আলোচনার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হবে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনা এগিয়ে নেওয়া। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব স্বার্থ ও রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। কোনো কোনো ইস্যুতে রাষ্ট্রগুলোর অবস্থান একেবারেই বিপরীত হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সভাপতির নিরপেক্ষতা, কূটনৈতিক দক্ষতা এবং আলোচনাকে সঠিক পথে পরিচালনার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে আসছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অভিবাসন, দারিদ্র্য বিমোচন এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থ—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশ তার অবস্থান তুলে ধরেছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে বৈশ্বিক ফোরামে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উপস্থিতি আরও দৃশ্যমান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিভিন্ন সমস্যা আন্তর্জাতিক আলোচনায় তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, উন্নয়নশীল অর্থনীতির ঋণচাপ, খাদ্য নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো বাংলাদেশসহ বহু দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে এসব ইস্যুতে আলোচনার সুযোগ থাকলেও সভাপতির মূল দায়িত্ব হবে সব সদস্য রাষ্ট্রকে সমানভাবে আলোচনার সুযোগ দেওয়া এবং প্রক্রিয়াকে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা।
বিশ্ব রাজনীতির বর্তমান বাস্তবতায় জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক সংঘাতের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের সীমাবদ্ধতা, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বিভাজন এবং বিভিন্ন প্রস্তাব বাস্তবায়নের জটিলতা বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় সাধারণ পরিষদ তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত প্রতিনিধিত্বের একটি মঞ্চ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
ড. খলিলুর রহমানের দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামনে সেই বৃহৎ মঞ্চে কূটনৈতিক সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এই দায়িত্বের সঙ্গে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বিশ্বের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর পাশাপাশি ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য রাখা সহজ কাজ নয়। বিভিন্ন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্তের পরিবর্তে দীর্ঘ আলোচনা প্রয়োজন হতে পারে। কোথাও আবার রাজনৈতিক উত্তেজনা আলোচনার পরিবেশকে কঠিন করে তুলতে পারে।
সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে সভাপতির নিরপেক্ষ অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি রাষ্ট্র বা গোষ্ঠীর স্বার্থের সঙ্গে সভাপতির অবস্থানকে যেন একীভূত করা না হয়, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা। সভাপতির নেতৃত্বে অধিবেশনের নিয়ম মেনে আলোচনা পরিচালিত হওয়া এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ নিশ্চিত করা সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
বাংলাদেশের জন্য এ দায়িত্বের আরেকটি তাৎপর্য রয়েছে দেশের দীর্ঘ কূটনৈতিক ঐতিহ্যের দিক থেকেও। স্বাধীনতার পর থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বৈশ্বিক শান্তি, উন্নয়ন ও সহযোগিতার বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব বাংলাদেশের কূটনীতিক ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি বড় দায়িত্বের ক্ষেত্র তৈরি করবে। এক বছরের মেয়াদে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আলোচনায় আসবে, সেগুলোর প্রক্রিয়াগত নেতৃত্বের সঙ্গে বাংলাদেশের নামও যুক্ত থাকবে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সক্ষমতা ও বহুপাক্ষিক কূটনীতিতে অভিজ্ঞতা প্রদর্শনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে এই দায়িত্বকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থের সরাসরি প্রতিফলন হিসেবে দেখার পরিবর্তে জাতিসংঘের সামগ্রিক কাঠামোর মধ্যে সভাপতির নিরপেক্ষ দায়িত্ব হিসেবে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ পরিষদের সভাপতি কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং সাধারণ পরিষদের অধিবেশন পরিচালনাকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দায়িত্ব পালনের সময় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ভারসাম্য ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান সংঘাত ও উত্তেজনার মধ্যে নতুন অধিবেশন শুরু হওয়ায় সাধারণ পরিষদের আলোচনায় শান্তি ও কূটনীতির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বেসামরিক মানুষের জীবনহানি, বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সহায়তার প্রয়োজন এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে জলবায়ু সংকট ও অর্থনৈতিক চাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি বিষয়ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র খুঁজে বের করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সরাসরি সমঝোতা সম্ভব না হলেও আলোচনার দরজা খোলা রাখা বহুপাক্ষিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতেও এই দায়িত্বের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। দেশের একজন শীর্ষ কূটনীতিক যখন বিশ্বের বৃহত্তম বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের সাধারণ পরিষদের নেতৃত্বাধীন দায়িত্বে থাকবেন, তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পরিচিতি ও কূটনৈতিক ভূমিকা নিয়ে আগ্রহ বাড়বে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জাতিসংঘ এবং বৈশ্বিক সমস্যাগুলো সম্পর্কে আগ্রহ তৈরির ক্ষেত্রেও এটি একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হতে পারে।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কে দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে ড. খলিলুর রহমানের এক বছরের মেয়াদ শুরু হবে। এই সময়ে সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম কীভাবে এগিয়ে যায় এবং বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংলাপ কতটা কার্যকর হয়, সেদিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে।
বাংলাদেশের জন্যও এটি হবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির বড় একটি পরীক্ষার সময়। দায়িত্ব পালনের প্রতিটি পর্যায়ে নিরপেক্ষতা, দক্ষতা ও ভারসাম্য বজায় রাখতে পারলে সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। আর সেই প্রত্যাশা নিয়েই জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের নতুন অধিবেশনের যাত্রা শুরু হচ্ছে।


