প্রকাশ:০২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ফিফা আসিয়ান কাপের গ্রুপ পর্বে নিজেদের শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার কাছে ৯-২ গোলের বড় ব্যবধানে হেরেছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার রাতে জাকার্তার গেলোরা বুং কার্নো স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্বাগতিকদের হয়ে একাই পাঁচ গোল করেছেন মিচেল লি বেকার। এই জয়ে গ্রুপ ‘এ’-এর শীর্ষস্থান নিশ্চিত করে ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে ইন্দোনেশিয়া। অন্যদিকে টানা তিন ম্যাচে হেরে কোনো পয়েন্ট ছাড়াই প্রতিযোগিতা শেষ করেছে বাংলাদেশ।
ম্যাচের শুরু থেকেই বাংলাদেশের ওপর আক্রমণের চাপ তৈরি করে ইন্দোনেশিয়া। নিজেদের মাঠের দর্শকদের সামনে দ্রুত গোলের সন্ধানে থাকা স্বাগতিক দল বল দখল, গতি ও আক্রমণের বৈচিত্র্যে বাংলাদেশকে চাপে রাখে। মাত্র ১১ মিনিটেই গোলের দেখা পায় তারা। ডান দিক থেকে ওলে রোমেনির বাড়ানো বল থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বাংলাদেশের জালে বল পাঠান বেকার।
প্রথম গোলের পরও থামেনি ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণ। ২০ মিনিটে আবারও গোল করেন বেকার। বাংলাদেশের রক্ষণভাগের সামনে তৈরি হওয়া জটলার সুযোগ নিয়ে পেছন ফিরে দারুণ এক টাচে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ার পর বাংলাদেশ কিছুটা সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেও ইন্দোনেশিয়ার আক্রমণের গতি সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ৩২ মিনিটে রিজকি রিধোর গোলে স্বাগতিকরা ব্যবধান বাড়িয়ে ৩-০ করে। এরপর চার মিনিটের মধ্যেই বাংলাদেশের হয়ে একটি গোল ফিরিয়ে দেন শাহরিয়ার ইমন। শূকির ক্রস থেকে পাওয়া বলে হেড করে ইন্দোনেশিয়ার জালে বল পাঠান তিনি। কিছু সময়ের জন্য বাংলাদেশের শিবিরে আশার আলো দেখা গেলেও সেটি স্থায়ী হয়নি।
গোল হজমের পর দ্রুতই আবার নিয়ন্ত্রণ নেয় ইন্দোনেশিয়া। ৩৭ মিনিটে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন বেকার। মাত্র পাঁচ মিনিট পর আরও একবার গোল করে ব্যক্তিগত গোলসংখ্যা চার-এ নিয়ে যান তিনি। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে জাস্টিন হাবনারের গোলে ইন্দোনেশিয়া ৬-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায়।
প্রথমার্ধেই ছয় গোল হজম করায় বাংলাদেশের সামনে দ্বিতীয়ার্ধে বড় ব্যবধানের হার এড়ানোর চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়। বিরতির পর বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে জমাট রক্ষণে খেলার চেষ্টা করে। ইন্দোনেশিয়া আক্রমণ অব্যাহত রাখলেও দীর্ঘ সময় গোলের দেখা পায়নি। বাংলাদেশের গোলরক্ষক মেহেদী হাসান শ্রাবণও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে দলকে আরও বড় বিপর্যয় থেকে সাময়িকভাবে রক্ষা করেন।
দ্বিতীয়ার্ধের এই পর্যায়ে বাংলাদেশ কিছুটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম হলেও ম্যাচের শেষ মুহূর্তগুলো আবারও পুরোপুরি ইন্দোনেশিয়ার নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। একই সময়ে অনুষ্ঠিত অন্য ম্যাচে মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে ৬-০ গোলে হারাচ্ছিল। ফলে ফাইনালে যেতে ইন্দোনেশিয়ার সামনে গোল ব্যবধানের পাশাপাশি মোট গোলসংখ্যার হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
৯০ মিনিটে লুক ভিক্যারি ইন্দোনেশিয়ার সপ্তম গোল করেন। এর এক মিনিট পর বাংলাদেশের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন তরুণ ফরোয়ার্ড ফারহান আলি ওয়াহিদ। স্কোর তখন ৭-২। কিন্তু এই ব্যবধানও ইন্দোনেশিয়াকে স্বস্তি দিচ্ছিল না। ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করতে তাদের আরও গোল প্রয়োজন ছিল।
যোগ করা সময়ের ষষ্ঠ মিনিটে কেভিন ডিকস গোল করে ইন্দোনেশিয়াকে ৮-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। এরপরও থামেনি স্বাগতিকদের আক্রমণ। যোগ করা সময়ের সপ্তম মিনিটে নিজের পঞ্চম গোলটি করেন বেকার। তাঁর এই গোলেই ম্যাচের স্কোর দাঁড়ায় ৯-২ এবং ইন্দোনেশিয়ার ফাইনাল নিশ্চিত হয়।
এক ম্যাচে পাঁচ গোল করে বেকার হয়ে ওঠেন ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত খেলোয়াড়। ১৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের গতি, অবস্থান নির্বাচন ও ফিনিশিং বাংলাদেশের রক্ষণভাগকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে। তাঁর পাঁচ গোলের পাশাপাশি রিজকি রিধো, জাস্টিন হাবনার, লুক ভিক্যারি ও কেভিন ডিকস একটি করে গোল করেন।
বাংলাদেশের হয়ে গোল দুটি করেন শাহরিয়ার ইমন ও ফারহান আলি ওয়াহিদ। বিশেষ করে ইমনের প্রথমার্ধের গোলটি কিছু সময়ের জন্য ম্যাচে বাংলাদেশের ফেরার সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। কিন্তু দ্রুত পরপর দুই গোল হজম করায় সেই সম্ভাবনা আর বাস্তবে রূপ নেয়নি।
এই হার বাংলাদেশের জন্য আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে আগের দুই ম্যাচের ফলের কারণে। প্রতিযোগিতার প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে ৩-০ গোলে হারে বাংলাদেশ। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ১-০ গোলের পরাজয়। ফলে শেষ ম্যাচে ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে মাঠে নামার আগেই বাংলাদেশ ফাইনালের দৌড় থেকে ছিটকে গিয়েছিল। শেষ ম্যাচে লক্ষ্য ছিল অন্তত একটি ইতিবাচক ফল নিয়ে টুর্নামেন্ট শেষ করা। কিন্তু সেটি সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ইন্দোনেশিয়ার জন্য ম্যাচটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্রের। মালয়েশিয়ার সঙ্গে ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে গোল ব্যবধানের হিসাব তাদের জন্য বড় চাপ তৈরি করেছিল। মালয়েশিয়া সিঙ্গাপুরকে বড় ব্যবধানে হারানোয় ইন্দোনেশিয়ার ওপরও বড় ব্যবধানে জয়ের প্রয়োজন তৈরি হয়। শেষ মুহূর্তে পরপর গোল করে তারা সেই সমীকরণ নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসে।
ম্যাচের ফল বাংলাদেশের ফুটবলের সাম্প্রতিক বাস্তবতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। এত বড় ব্যবধানে পরাজয়ের পর জাতীয় দলের প্রস্তুতি, ঘরোয়া ফুটবলের মান, শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে নিয়মিত খেলার সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশের কোচ টমাস ডুলি ম্যাচ শেষে বড় পরাজয়ের জন্য কোনো অজুহাত দেখাননি। এমন হার তাঁর কোচিং ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় পরাজয় কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এটিকে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় হার হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, এমন অভিজ্ঞতা যেন আর ফিরে না আসে।
তবে ডুলির বক্তব্যে শুধু তাৎক্ষণিক ম্যাচের ব্যর্থতার চেয়ে বাংলাদেশের ফুটবলের কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর মতে, শক্তিশালী দলের সঙ্গে নিয়মিত খেলার অভিজ্ঞতা না থাকলে নিজেদের দুর্বলতা বোঝা কঠিন। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দলকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস পাওয়া গেলেও দ্রুতগতির ও শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে খেললে বাস্তব পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের র্যাঙ্কিং এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শীর্ষ দলগুলোর অবস্থানের পার্থক্যও তিনি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, আন্তর্জাতিক ফুটবলে উন্নতি করতে হলে শুধু ফল নয়, প্রতিপক্ষের মান, ম্যাচের গতি এবং প্রতিযোগিতার পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
এই ম্যাচে বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য সেই পার্থক্যই সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত পাসিং, আক্রমণ পরিবর্তনের গতি এবং গোলের সামনে কার্যকর ফিনিশিংয়ের বিপরীতে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় নিজেদের ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি। বিশেষ করে প্রথমার্ধে রক্ষণভাগের সমন্বয়ের ঘাটতি স্বাগতিকদের বারবার সুযোগ করে দেয়।
তবে দ্বিতীয়ার্ধের বড় একটি অংশে বাংলাদেশ গোল না খেয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পেরেছিল। গোলরক্ষক শ্রাবণের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভও দলের ব্যবধান আরও বাড়তে দেয়নি। শেষদিকে ইন্দোনেশিয়ার অতিরিক্ত আক্রমণ এবং বাংলাদেশের রক্ষণ দুর্বল হয়ে পড়ায় আবারও দ্রুত গোল আসে।
ফাইনালে ওঠার আনন্দে যখন জাকার্তার গ্যালারিতে ইন্দোনেশিয়ার সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, তখন বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের জন্য রাতটি হয়ে ওঠে হতাশার। মাঠে ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের হতাশ মুখে মাঠ ছাড়তে দেখা যায়। জাতীয় দলের জন্য এটি শুধু একটি বড় ব্যবধানে হার নয়, বরং আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে নতুন করে ভাবার একটি অভিজ্ঞতাও হয়ে থাকল।
ইন্দোনেশিয়া সাত পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘এ’-এর শীর্ষে থেকে ফাইনালে উঠেছে। মালয়েশিয়াও তিন ম্যাচে চার পয়েন্ট অর্জন করলেও গোলসংখ্যার হিসাবে পিছিয়ে পড়ে ফাইনালের সুযোগ হারায়। বাংলাদেশ তিন ম্যাচে কোনো পয়েন্ট না পেয়ে গ্রুপের শেষ অবস্থানে থেকে আসর শেষ করেছে।
ফুটবলে বড় পরাজয় যেমন হতাশা তৈরি করে, তেমনি সঠিক বিশ্লেষণের সুযোগও তৈরি করে। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই বিশ্লেষণকে কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতের প্রস্তুতি সাজানোর চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে হলে শক্তিশালী দলের বিপক্ষে নিয়মিত ম্যাচ, খেলোয়াড়দের প্রস্তুতি এবং ঘরোয়া ফুটবলের মানোন্নয়ন—এসব বিষয় কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সেটিই সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।


