প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার নলজুড়ি সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মো. বাবলা লিটন (২৮) নামে এক বাংলাদেশি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। মঙ্গলবার ভোরে সীমান্তের নলজুড়ি মাঠ এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। তাঁর হাতে গুলি লেগেছে বলে জানা গেছে। ঘটনার বিষয়টি বুধবার রাতে প্রকাশ্যে আসে।
বাবলা লিটন গোয়াইনঘাটের নলজুড়ি এলাকার বাসিন্দা। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে আরও সাত থেকে আটজন ছিলেন বলে বিজিবির করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলায় বাবলা লিটনসহ অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা, সরকারি কাজে বাধা এবং বিজিবি সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।
মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোরে সীমান্তের ১২৭৮/৪ নম্বর পিলারের কাছ দিয়ে বাবলা লিটনসহ কয়েকজন ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ করা হয়। এ সময় বিএসএফ সদস্যরা তাঁদের ধাওয়া করেন। তখন ওই ব্যক্তিরা বিএসএফ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেন বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পর বিএসএফ সদস্যরা চারটি গুলি ছোড়েন। এতে বাবলা লিটনের হাতে গুলি লাগে।
এজাহারে আরও বলা হয়েছে, গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও বাবলা লিটনসহ তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা বিএসএফ সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাথর নিক্ষেপ করেন। খবর পেয়ে সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির তামাবিল ক্যাম্পের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গেলে তাঁদের লক্ষ্য করেও ইট-পাথর ছোড়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এতে কয়েকজন বিজিবি সদস্য সাধারণভাবে আহত হয়েছেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিজিবি সদস্যরা পাঁচটি ফাঁকা গুলি ছোড়েন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর সেখানে থাকা ব্যক্তিরা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান বলে বিজিবির পক্ষ থেকে জানানো হয়। ঘটনাটি ঘিরে সীমান্ত এলাকায় কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ঘটনার পর মঙ্গলবার রাতেই গোয়াইনঘাট থানায় মামলা করে বিজিবি। সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির তামাবিল ক্যাম্পের কমান্ডার মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা বাদী হয়ে মামলাটি করেন। মামলায় বাবলা লিটনকে আসামি করার পাশাপাশি আরও কয়েকজন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক মোড়ল জানিয়েছেন, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে মামলার অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সিলেট ব্যাটালিয়ন ৪৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ নাজমুল হক বলেন, বিজিবি সদস্যদের লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল ছোড়া হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সতর্কতামূলকভাবে চার থেকে পাঁচটি গুলি ছোড়া হয়। তিনি জানান, এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে।
এদিকে স্থানীয় একটি প্রতিবেদনে ঘটনাটিকে মানবপাচারের চেষ্টার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে আরও গুরুতর অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, বাবলা লিটনের নেতৃত্বে কয়েকজনকে অবৈধভাবে ভারতে পাঠানোর চেষ্টা চলছিল এবং এ সময় বিএসএফের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তবে এই অতিরিক্ত অভিযোগটি এখনো আদালতে প্রমাণিত নয় এবং মূলধারার প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ বিষয়ে একই মাত্রার তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তসাপেক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
সীমান্ত এলাকায় এ ধরনের ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির আহত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর সঙ্গে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, অবৈধ পারাপার এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও জড়িয়ে থাকে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জনপদে বসবাসকারী মানুষের চলাচল ও জীবিকার বাস্তবতার কারণে এসব ঘটনায় দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
নলজুড়ি ও তামাবিল এলাকা সিলেটের গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত অঞ্চল। এ এলাকায় সীমান্তের নিরাপত্তা, অবৈধ পারাপার ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবির নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান রয়েছে। বুধবারও ৪৮ বিজিবি গোয়াইনঘাটের প্রতাপপুর সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৩ হাজার ৫০০ কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ, ১২০ বোতল মদসহ বিভিন্ন পণ্য জব্দ করেছে বলে জানিয়েছে। জব্দ করা এসব পণ্যের আনুমানিক মূল্য ৬০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা।
সীমান্তে নিরাপত্তা ও চোরাচালানবিরোধী তৎপরতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে অবৈধভাবে সীমান্ত পারাপারের ঘটনাও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে রয়েছে। গত কয়েক দিনে গোয়াইনঘাটের সীমান্তবর্তী এলাকায় উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কয়েকজনকে ভারতে পাঠানোর অভিযোগে সাত বাংলাদেশিকে আটকের ঘটনাও ঘটেছে। এসব ঘটনা সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে মানুষ পারাপারের ঝুঁকির বিষয়টি সামনে এনেছে।
বাবলা লিটন আহত হওয়ার পর তাঁর চিকিৎসা কোথায় হয়েছে বা বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা কী—এ বিষয়ে পুলিশ বা বিজিবির পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিদের পরিচয় ও তাঁদের অবস্থান সম্পর্কেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ঘটনার প্রকৃত কারণ ও পরিস্থিতি নির্ধারণে এখন মামলার তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিএসএফ কেন গুলি চালিয়েছে, সীমান্তে থাকা ব্যক্তিরা ঠিক কী করছিলেন, ইট-পাথর নিক্ষেপের ঘটনা কীভাবে শুরু হয়েছিল এবং বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর কী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার হতে পারে।
একই সঙ্গে সীমান্তে গুলিবর্ষণের ঘটনায় আহত বাংলাদেশি নাগরিকের বিষয়ে যথাযথ তথ্য সংগ্রহ এবং দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় যোগাযোগও গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্তে উত্তেজনা যাতে আরও না বাড়ে, সে জন্য ঘটনাগুলো দ্রুত যাচাই করে দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা প্রয়োজন।
এ মুহূর্তে নিশ্চিত তথ্য হলো, গোয়াইনঘাটের নলজুড়ি সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাবলা লিটন নামে এক বাংলাদেশি আহত হয়েছেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিজিবির পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছে। মামলায় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা ও বিজিবির কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালাচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট তদন্ত ও পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।


