বজ্রপাত আতঙ্কে হাওরের কৃষক, বাড়ছে আশ্রয়কেন্দ্রের দাবি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল বরাবরই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মাছ ও ধানের ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালেই প্রতি বছর মৃত্যুভয় নিয়ে জীবনযাপন করেন হাজারো কৃষক ও মৎস্যজীবী। বিশেষ করে বোরো ধান কাটার মৌসুম এবং বর্ষার শুরুর সময় হাওরজুড়ে বজ্রপাত যেন এক নীরব মৃত্যুদূত হয়ে দেখা দেয়। আকাশে কালো মেঘ জমলেই বুক কেঁপে ওঠে কৃষকদের। কারণ, খোলা হাওরে বজ্রপাত থেকে বাঁচার মতো নিরাপদ আশ্রয় কিংবা প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং ও এর আশপাশের হাওর এলাকায় এখন সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে বজ্রপাত প্রতিরোধ। স্থানীয়দের ভাষায়, “বজ্রপাত এখন আতঙ্কের আরেক নাম।” প্রতিবছর অসংখ্য কৃষক মাঠে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারান। কেউ ধান কাটতে গিয়ে, কেউ মাছ ধরতে গিয়ে, আবার কেউ নৌকায় চলাচলের সময় বজ্রাঘাতে নিহত হন। ফলে প্রতিটি হাওড়ে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড এবং বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের দাবি এখন সাধারণ মানুষের গণদাবিতে পরিণত হয়েছে।

সরেজমিনে হাওরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায়, মাইলের পর মাইলজুড়ে বিস্তৃত ধানের মাঠ। চারদিকে শুধু পানি আর ফসলের সমারোহ। কিন্তু বিপদের সময় আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো স্থাপনা নেই। দূরে কোনো গাছ নেই, নেই উঁচু দালান কিংবা নিরাপদ ছাউনি। হঠাৎ কালবৈশাখীর কালো মেঘ এসে বজ্রপাত শুরু হলে কৃষকরা ছোটাছুটি শুরু করেন। অনেকে জমির আইলে উপুড় হয়ে পড়ে থাকেন, কেউবা ট্রলির নিচে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু অধিকাংশ সময় তাতেও রক্ষা মেলে না।

৫ নম্বর দৌলতপুর ইউনিয়নের হাওরপাড়ের কৃষক হোসেন আলী বলেন, “আকাশে মেঘ ডাকলেই বুক কাঁপে। কিন্তু পাকা ধান ফেলে তো বাড়ি যাওয়া যায় না। যদি মাঠে একটা নিরাপদ ঘর থাকত, তাহলে অনেক মানুষ বাঁচত।”

আজমিরীগঞ্জ সড়ক সংলগ্ন হাওরের কৃষক আরশাদ আলী স্মৃতিচারণ করে বলেন, গত বছর তার চোখের সামনে বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছিল। সেই দৃশ্য এখনো তাকে তাড়া করে ফেরে। তিনি বলেন, “আমরা মাঠে যাই জান হাতে নিয়ে। কিন্তু না গেলেও তো সংসার চলবে না।”

একই ধরনের আতঙ্কের কথা জানান বানিয়াচংয়ের উত্তর-পূর্ব ইউনিয়নের কৃষক বাছির মিয়া। তিনি বলেন, “হাওরের মাঝখানে কোনো আশ্রয় নাই। মেঘ ডাকলে বুঝি না কোথায় যামু। সরকার যদি ছোট ছোট আশ্রয়কেন্দ্র বানাইয়া দিত, তাহলে অন্তত দৌড়ে গিয়ে প্রাণ বাঁচানো যেত।”

স্থানীয়দের মতে, শুধু বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড বসালেই হবে না, পাশাপাশি প্রতিটি বড় হাওরে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর পাকা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ জরুরি। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে বজ্রপাত প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা এবং প্রাথমিক চিকিৎসার সুবিধা থাকলে তা কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে। এছাড়া মাঠে দীর্ঘ সময় কাজ করা কৃষকরা দুপুরের বিশ্রাম বা খাবারের সময়ও এসব কেন্দ্র ব্যবহার করতে পারবেন।

ক্ষুদ্র কৃষক লতিফ খান বলেন, “বজ্রপাত তো গরিব মানুষের আজরাইল। বড়লোকেরা ঘরে বসে বৃষ্টি দেখে, আর আমরা মরণ মাথায় নিয়ে মাঠে কাজ করি। ঘরে মা-বউ কাঁদে, কিন্তু না গেলে তো না খাইয়া থাকতে হবে।”

বাংলাদেশে প্রতিবছর বজ্রপাতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার তথ্যমতে, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় হাওর এলাকা বজ্রপাতের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোর একটি। ভৌগোলিক অবস্থান, বিস্তীর্ণ খোলা জলাভূমি এবং উঁচু স্থাপনার অভাবের কারণে বজ্রপাতের সময় মানুষ সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও বজ্রপাতের প্রবণতা বেড়েছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুমণ্ডলের অস্থিতিশীলতা এবং কালবৈশাখীর তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে আগের তুলনায় এখন বেশি বজ্রপাত হচ্ছে। ফলে হাওরাঞ্চলে টেকসই সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, প্রতিটি হাওরে অন্তত ৫০০ মিটার বা এক কিলোমিটার পরপর ছোট ছোট পাকা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা গেলে প্রাণহানি অনেকাংশে কমে আসবে। পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বজ্রপাত বিষয়ে আরও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তারা।

এ বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে কিছু প্রকল্প নিয়ে কাজ চলছে। কয়েকটি হাওরে পরীক্ষামূলকভাবে বজ্রপাত নিরোধক দণ্ড স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। তবে বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে সব এলাকায় একসঙ্গে কাজ শুরু করা সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এনামুল হক বলেন, “আমরা কৃষকদের নিয়মিত সচেতন করছি। বজ্রপাতের সময় কী করতে হবে, কীভাবে নিরাপদে থাকতে হবে—এসব বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে অবকাঠামোগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করলে প্রাণহানি পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, কৃষি উৎপাদনের জন্য হাওরাঞ্চল দেশের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এখানকার কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকেও সুরক্ষিত রাখা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রতি বছর বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটলেও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা যায়। অনেক সময় দুর্ঘটনার পর সাময়িক আলোচনা হয়, কিন্তু পরে তা হারিয়ে যায়। ফলে বছর ঘুরে আবারও একই আতঙ্ক নিয়ে মাঠে নামতে হয় কৃষকদের।

হাওরের মানুষ বলছেন, তারা দয়া নয়, নিরাপত্তা চান। তাদের দাবি, যেমনভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে, তেমনি হাওরাঞ্চলেও বজ্রপাত ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কারণ দেশের খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমেই বাঁচাতে হবে এখানকার মানুষদের।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ফয়সলকে মনোনয়ন দিচ্ছে বিএনপি

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

৩৩ মাস পর ভারতের কারাগার থেকে দেশে ফিরলেন তিনজন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তারেককে ক্ষমতা ছাড়ার পথ বেছে নিতে বললেন নাহিদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নতুন পে-স্কেলে বাড়তি বেতন কবে থেকে মিলবে

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিলল চার বস্তা টাকা

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনে ফয়সলকে মনোনয়ন দিচ্ছে বিএনপি

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

৩৩ মাস পর ভারতের কারাগার থেকে দেশে ফিরলেন তিনজন

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তারেককে ক্ষমতা ছাড়ার পথ বেছে নিতে বললেন নাহিদ

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

নতুন পে-স্কেলে বাড়তি বেতন কবে থেকে মিলবে

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাহজালাল মাজারের দানবাক্সে মিলল চার বস্তা টাকা

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ওসমানীনগরে ছাত্রলীগের মশাল মিছিলের প্রস্তুতি, গ্রেপ্তার ৭

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ধর্ম পালনে বাধা নেই, এটাই বাংলাদেশ: কয়েস লোদী

প্রকাশ: ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সুনামগঞ্জে তিন শিশুর মৃত্যু, বাবাও হাসপাতালে

প্রকাশ:১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ