জুড়ীতে বিষ প্রয়োগের অভিযোগে ২০ টন মাছ নিধন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলায় একটি বড় মৎস্য খামারে বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। খামারমালিকের অভিযোগ, রাতের আঁধারে দুর্বৃত্তরা খামারের পানিতে বিষ প্রয়োগ করায় প্রায় ২০ টন মাছ মারা গেছে। এক রাতের ব্যবধানে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ায় খামারমালিকের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে মাছ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হয়নি। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও পুলিশ।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়নের ধামাই চা বাগানের নলডুড়ী বস্তি সংলগ্ন এলাকায়। সেখানে খামারমালিক ইলিয়াস মিয়া সরদারের প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে গড়ে ওঠা মৎস্য খামারে বৃহস্পতিবার সকালে বিপুলসংখ্যক মাছ পানিতে ভেসে উঠতে দেখা যায়। ভোরের আলো ফুটতেই খামারের বিভিন্ন অংশে মৃত মাছ ভেসে ওঠার দৃশ্য চোখে পড়ে। বিষয়টি দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।

খামারটির আকার বড় হওয়ায় একসঙ্গে এত মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যেও বিস্ময় তৈরি করেছে। খামারের পানি ও আশপাশের এলাকায় মাছের দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল থেকেই শ্রমিকরা খামার থেকে মৃত মাছ তুলে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেন। প্রায় ২০ জন শ্রমিক দীর্ঘ সময় ধরে মাছ সংগ্রহ করে গর্ত তৈরি করে সেগুলো মাটিচাপা দেওয়ার কাজ করেন।

খামারমালিক ইলিয়াস মিয়া সরদারের দাবি, রাতের কোনো এক সময়ে খামারের পানিতে বিষ প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। কারণ অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যাওয়ার বিষয়টি তাঁকে সন্দেহের মধ্যে ফেলেছে। তবে কে বা কারা এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। তাঁর ধারণা, পরিকল্পিতভাবে কেউ ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত ইলিয়াস মিয়া সরদারের জন্য এ ঘটনা বড় ধরনের আর্থিক আঘাত হয়ে এসেছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও পুঁজি বিনিয়োগ করে তিনি খামারটি গড়ে তুলেছেন। মাছ চাষের ওপর নির্ভর করে তাঁর পরিবারের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়ে আসছিল। খামারে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ মাছ মারা যাওয়ায় শুধু একটি দিনের উৎপাদন নয়, দীর্ঘদিনের শ্রম ও বিনিয়োগও বড় ধরনের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, ঘটনার পর থেকেই ইলিয়াস মিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফল এক রাতের মধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়ার দৃশ্য তাঁর জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ইলিয়াস মিয়া সরদারের ছেলে আব্দুর রহিম বলেন, তাঁদের পরিবার মাছগুলো বাজারে বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু বিক্রির আগের রাতেই খামারের বিপুলসংখ্যক মাছ মারা যায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাবার সঙ্গে মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত এবং খামারের কার্যক্রম কাছ থেকে দেখে আসছেন। তাঁর ভাষ্য, অক্সিজেনের ঘাটতির কারণে আগে কখনো এভাবে এত মাছ মারা যাওয়ার ঘটনা তিনি দেখেননি। এ কারণে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে বিষ প্রয়োগের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আব্দুর রহিম আরও দাবি করেন, তাঁর বাবার সঙ্গে কারও বিরোধ বা শত্রুতা থেকে এ ঘটনা ঘটতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ রয়েছে। তবে এটি এখনো তাঁদের ধারণা মাত্র; এর পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট প্রমাণ তাঁদের হাতে নেই। ফলে প্রকৃত ঘটনা কী, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ঘটনার খবর পেয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। পশ্চিম জুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম জানান, খামারে মাছ মারা যাওয়ার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যদি তদন্তে বিষ প্রয়োগের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায় এবং এ ঘটনায় কেউ জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তিনি মনে করেন।

মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকেও বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানানো হয়েছে। জুড়ী উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা মিসবাহ উদ্দিন আফজল জানান, তিনি ঘটনার বিষয়ে জানতে পেরেছেন এবং বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাছের আকস্মিক মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, পানির অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

এদিকে জুড়ী থানার পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়নি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের চেষ্টা করা হবে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, এত বিপুলসংখ্যক মাছ কী কারণে মারা গেল। খামারমালিকের পক্ষ থেকে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ তোলা হলেও তদন্ত ছাড়া সেটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পানিতে বিষাক্ত কোনো পদার্থ মিশে যাওয়া, পানির গুণগত পরিবর্তন, অক্সিজেনের ঘাটতি কিংবা অন্য কোনো পরিবেশগত কারণেও মাছ মারা যেতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ জানতে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ও সরেজমিন তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু একটি মৎস্য খামারের আর্থিক ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিকল্পিতভাবে কোনো খামারের উৎপাদন নষ্ট করা হলে তা স্থানীয় পর্যায়ে মৎস্যচাষিদের নিরাপত্তা ও বিনিয়োগের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে যেসব উদ্যোক্তা দীর্ঘদিনের সঞ্চয় ও ঋণ বা নিজস্ব পুঁজি বিনিয়োগ করে মাছ চাষ করেন, তাঁদের জন্য এ ধরনের ক্ষতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও এ ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাঁরা দ্রুত ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যদি পরিকল্পিতভাবে বিষ প্রয়োগের ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত খামারমালিকের পাশে দাঁড়ানো এবং প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার কথাও বলেছেন স্থানীয়রা।

মাছ চাষ বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পরিবার নিজেদের জমি, পুকুর কিংবা বাণিজ্যিক খামারে মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। একটি খামারে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক মাছ মারা গেলে এর প্রভাব শুধু খামারমালিকের ওপর নয়, শ্রমিক, স্থানীয় ব্যবসা এবং সংশ্লিষ্ট বাজারব্যবস্থার ওপরও পড়ে। জুড়ীর এই ঘটনায়ও সেই বাস্তবতাই সামনে এসেছে।

এখন ইলিয়াস মিয়া সরদারের পরিবারের প্রধান প্রত্যাশা, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হবে এবং মাছ মৃত্যুর প্রকৃত কারণ দ্রুত জানা যাবে। যদি কারও ইচ্ছাকৃত কর্মকাণ্ডে এ ক্ষতি হয়ে থাকে, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটি যেন ন্যায্য সহায়তা পায়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। আর যদি প্রাকৃতিক বা পরিবেশগত কোনো কারণে মাছ মারা গিয়ে থাকে, তাহলেও কারণটি শনাক্ত করে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

এক রাতের ব্যবধানে প্রায় ২০ টন মাছ হারানোর ঘটনা তাই শুধু একটি খামারের ক্ষতির গল্প নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন উদ্যোক্তার দীর্ঘদিনের শ্রম, পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা এবং স্থানীয় মৎস্যচাষের ওপর মানুষের আস্থা। তদন্তের ফলেই পরিষ্কার হবে এই বিপুল মাছের মৃত্যুর পেছনে আসলে কী কারণ ছিল। সেই উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় এখন খামারমালিকের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সংশ্লিষ্ট সবাই।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সিলেটের সিলামে ওয়াকফ বিরোধে সংঘর্ষ, যুবক নিহত

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামে ৯ মাসে ১৮২ জনের মৃত্যু

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ব্রোঞ্জ হারিয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন সালাহউদ্দীন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্গাপূজায় শিক্ষার্থীদের টানা ৯ দিনের ছুটি

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে এবার ৬৩৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সিলেটের সিলামে ওয়াকফ বিরোধে সংঘর্ষ, যুবক নিহত

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে হামে ৯ মাসে ১৮২ জনের মৃত্যু

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ব্রোঞ্জ হারিয়ে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইলেন সালাহউদ্দীন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দুর্গাপূজায় শিক্ষার্থীদের টানা ৯ দিনের ছুটি

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে এবার ৬৩৬ মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আদালতে হাতকড়া-হেলমেট নিয়ে ক্ষুব্ধ আখতারুজ্জামান

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশকে বিনিয়োগের বড় কেন্দ্রে রূপান্তরের লক্ষ্য সরকারের

প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় কৃষক কার্ড পেলেন ১,৭৬১ কৃষক

প্রকাশ: ০২ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ