প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগে অসঙ্গতি ও প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন পাঁচ শিক্ষকসহ মোট নয়জন। পদত্যাগকারীরা সবাই বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন সাদা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে তারা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিও পালন করেছেন।
সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের কাছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন তারা। এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষকরা মানববন্ধন ও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে তারা উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবেশ ও শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
পদত্যাগকারীদের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন আবাসিক হলের প্রভোস্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা একাধিক শিক্ষক রয়েছেন। এর মধ্যে এমএজি ওসমানী হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. কাওছার হোসেন, শহীদ জিয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউসুফ মিয়া, হযরত শাহজালাল (রহ.) হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. নাজমুল হক, হযরত শাহপরান (রহ.) হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. জসিম উদ্দিন এবং দূররে সামাদ রহমান হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো. শাহজাহান মজুমদার রয়েছেন। প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যেও কয়েকজন পদত্যাগ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া শিক্ষকরা অভিযোগ করেন, বর্তমান উপাচার্যের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, পর্যাপ্ত যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কিছু ব্যক্তিকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, উপাচার্যের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত পোষণকারী শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। কখনো শোকজ, কখনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তারা। তাদের মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
মানববন্ধনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও প্রত্যাশিত সমাধান পাওয়া যায়নি। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
পদত্যাগকারী শিক্ষকদের একজন অধ্যাপক ড. মো. কাওছার হোসেন বলেন, বর্তমান প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার পরিবেশ, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখার ক্ষেত্রে নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দায়িত্বে থেকে কাজ করা সম্ভব নয় মনে করেই তারা পদত্যাগ করেছেন।
শিক্ষকদের এই পদত্যাগের ঘটনা এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যকে ঘিরে শিক্ষক মহলে আগে থেকেই মতবিরোধ ও উত্তেজনা রয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নিয়োগ ও প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উপাচার্যের সঙ্গে একদল শিক্ষকের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে। ওই সময় উপাচার্যের কার্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। এতে কয়েকজন শিক্ষক আহত হন। ওই ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।
এরপর থেকেই এক পক্ষের শিক্ষকরা উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ তুলে আসছেন। তাদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, পদোন্নতি ও পদায়নে বাধা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। অন্যদিকে উপাচার্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন।
সর্বশেষ পদত্যাগ ও মানববন্ধনের ঘটনাতেও উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আলিমুল ইসলাম শিক্ষকদের অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
উপাচার্য বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব শিক্ষক ও কর্মকর্তা নিয়োগ পেয়েছেন, তারা সংশ্লিষ্ট পদের জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা পূরণ করেন। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি করা হয়নি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়ম ও বিধিবিধান অনুসরণ করেই বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
ফলে একই ঘটনার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। একদিকে পদত্যাগকারী শিক্ষকরা প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে উপাচার্যের অপসারণ দাবি করছেন। অন্যদিকে উপাচার্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অস্থিতিশীল করতেই একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলছে।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের একযোগে পদত্যাগের ঘটনা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ তৈরি করেছে। আবাসিক হল পরিচালনা, পরীক্ষা, শরীরচর্চা, অতিথিশালা ও রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা সরে দাঁড়ালে এসব কার্যক্রমে সাময়িক চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে, চলমান বিরোধ দ্রুত সমাধান না হলে এর প্রভাব একাডেমিক কার্যক্রমেও পড়তে পারে। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, শিক্ষার্থীদের সেবা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে জটিলতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ যাচাই ও যথাযথ তদন্তের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্যও এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে যাতে শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আরও বিভাজন তৈরি না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পদত্যাগকারী শিক্ষকরা উপাচার্যের অপসারণের দাবিতে তাদের অবস্থান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছেন। তবে তাদের অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্বাধীন তদন্ত বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগগুলোকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একইভাবে উপাচার্যের পক্ষ থেকে দেওয়া অস্বীকৃতিও একটি পক্ষের বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এ অবস্থায় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের মধ্যকার বিরোধ কোন পথে গড়ায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে অভিযোগগুলোর স্বচ্ছ তদন্ত, পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


