প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারে পৃথক অভিযানে সাবেক সংসদ সদস্যের ছেলে ফজলে রাব্বি সাদমান এবং জেলা যুবলীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট গৌছ উদ্দিন নিক্সনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সোমবার (২ নভেম্বর) রাতে মৌলভীবাজার শহরের পৃথক এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, দুজনের বিরুদ্ধেই মৌলভীবাজার মডেল থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তার ফজলে রাব্বি সাদমান মৌলভীবাজার-৩ (সদর-রাজনগর) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি নেছার আহমেদের ছোট ছেলে। সোমবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে মৌলভীবাজার শহরের একটি এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে মৌলভীবাজার মডেল থানায় মামলা রয়েছে।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের পর সাদমানকে থানায় নেওয়া হয় এবং তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। তবে কোন মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং মামলাগুলোর সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
ফজলে রাব্বি সাদমানের বাবা নেছার আহমেদ মৌলভীবাজার-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবং মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তার ছেলে সাদমানও ওই সময়ের পর আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে একই রাতে পৃথক একটি অভিযানে মৌলভীবাজার জেলা যুবলীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট গৌছ উদ্দিন নিক্সনকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২ নভেম্বর দিবাগত রাতে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তার বিরুদ্ধেও মৌলভীবাজার মডেল থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন অভিযোগে গৌছ উদ্দিন নিক্সনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে। এসব মামলার তদন্ত ও আইনগত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের দাবি, ৫ আগস্টের পর থেকে গৌছ উদ্দিন নিক্সনও আত্মগোপনে ছিলেন। দীর্ঘ সময় পর তাকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
দুই নেতার গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা মৌলভীবাজার শহরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। তাদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা রয়েছে এবং এসব মামলার পরিপ্রেক্ষিতেই পুলিশ অভিযান চালিয়েছে।
ওসি সাইফুল ইসলাম আরও জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিভিন্ন মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
মৌলভীবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও মামলাকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের পর বিভিন্ন ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় জেলা পর্যায়ের রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ফজলে রাব্বি সাদমান ও গৌছ উদ্দিন নিক্সনের গ্রেপ্তার স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনার সৃষ্টি করেছে। একজন সাবেক সংসদ সদস্যের ছেলে এবং অন্যজন জেলা যুবলীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা নেতা হওয়ায় তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি স্থানীয়ভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে মামলাগুলোতে তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে।
গ্রেপ্তারের পর এখন তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত, আদালতে উপস্থাপন এবং পরবর্তী আইনগত কার্যক্রমের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে মামলাগুলোর অভিযোগ ও ঘটনার সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় বা পদমর্যাদার ভিত্তিতে আইনের বাইরে থাকবেন না। যাদের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে, তদন্তের স্বার্থে তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।
তবে গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে আদালতে দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না। ফলে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারিত হবে।
মৌলভীবাজার মডেল থানার পুলিশ জানিয়েছে, জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিভিন্ন মামলায় পলাতক আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে কেউ যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে প্রতিটি মামলার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন হবে এবং প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি রয়েছে। কারণ রাজনৈতিক সহিংসতা বা সংঘাতের ঘটনায় সাধারণ মানুষ ও স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।
ফজলে রাব্বি সাদমান ও গৌছ উদ্দিন নিক্সনের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে মৌলভীবাজারে চলমান মামলাগুলোর তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া আরও এগিয়ে যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সামনে আদালতের কার্যক্রম এবং তদন্তে নতুন কী তথ্য উঠে আসে, তার ওপর নির্ভর করবে মামলাগুলোর পরবর্তী অগ্রগতি। এদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রাখার কথা জানিয়েছে মৌলভীবাজার মডেল থানা।


