প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরের কাষ্টঘর সুইপার কলোনিতে হৃদয় কুমার হরিজন (৩৩) হত্যা মামলায় প্রধান আসামি আমিন আহমদকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। স্ত্রীর ছবি ও ভিডিও ধারণের প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে হৃদয়কে ছুরিকাঘাত করা হয় বলে মামলার এজাহার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তথ্য থেকে জানা গেছে। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার শুক্রবাড়ি বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে আমিন আহমদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি সিলেট নগরের এয়ারপোর্ট থানার নালিয়া এলাকার বাসিন্দা। তার বাবার নাম শহিদ আহমদ। হত্যা মামলায় তিনি এজাহারনামীয় এক নম্বর আসামি।
এসআরবি জানিয়েছে, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমিন আহমদকে কোতোয়ালী মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
মামলার এজাহার ও এসআরবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১১ অক্টোবর রাতে কাষ্টঘর সুইপার কলোনিতে হৃদয় কুমার হরিজনের বাসার সামনে তার স্ত্রীর ছবি ও ভিডিও ধারণ করছিলেন আমিন আহমদ। বিষয়টি দেখতে পেয়ে হৃদয় এর প্রতিবাদ করেন। এ সময় আমিন ও তার সঙ্গে থাকা সহযোগীদের সঙ্গে হৃদয়ের কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাকে গালিগালাজ করা এবং দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাত ৮টার দিকে হৃদয়কে কাষ্টঘর সুইপার কলোনির কাছাকাছি রাজু স্টোরের বিপরীত পাশের একটি ফাঁকা জায়গায় ডেকে নেওয়া হয় বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে তাকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
ছুরিকাঘাতে হৃদয়ের বাম পায়ের হাঁটুর ওপরের সামনের ও পেছনের অংশে গুরুতর জখম হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে স্থানীয়রা দ্রুত সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৯টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনকে মুহূর্তেই বদলে দেওয়া এই ঘটনায় এলাকায় শোকের পরিবেশ তৈরি হয়। স্বজন ও স্থানীয়দের কাছে হৃদয়ের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, বরং একটি পরিবারের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। স্ত্রীর ছবি তোলার প্রতিবাদকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নেওয়ায় ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হৃদয় কুমার হরিজনের মৃত্যুর ঘটনায় তার স্ত্রী বাদী হয়ে সিলেট কোতোয়ালী মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলা দায়েরের পর জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি ঘটনার পেছনের কারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখতে ছায়া তদন্ত শুরু করে এসআরবি-৯।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করে আসছিল। এরই মধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান আসামি আমিন আহমদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। পরে জৈন্তাপুর উপজেলার শুক্রবাড়ি বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এসআরবির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গ্রেপ্তার আমিন আহমদকে কোতোয়ালী মডেল থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এখন মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে তার কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে আরও তথ্য জানার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অন্য যারা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে গত ১৫ অক্টোবর নরসিংদীর মাধবদী থানার পাঁচদোনা এলাকা থেকে এই হত্যা মামলার আরও তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে রয়েছেন বালাগঞ্জ থানার নূরপুর গ্রামের আব্দুল হামিদের ছেলে ইমন আহমেদ (২৬), জালালাবাদ থানার বলাউড়া গ্রামের মো. হরুফ আলী মিয়ার ছেলে রুমান আহমদ সাজ্জাদ (২৫) এবং একই থানার সোনাতলা গ্রামের নুর মিয়ার ছেলে পারভেজ (২২)।
ফলে হৃদয় হত্যা মামলায় এখন পর্যন্ত একাধিক আসামি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। প্রধান আসামি আমিন আহমদকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে মামলার তদন্তে আরও অগ্রগতি হবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।
তবে মামলার অভিযোগ, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের আইনগতভাবে নির্দোষ হিসেবে বিবেচনা করার বিধান রয়েছে। তদন্তে ঘটনার প্রকৃত চিত্র এবং প্রত্যেকের ভূমিকা স্পষ্ট হওয়ার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ঘটনার সূত্রপাত থেকে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সময়ের প্রতিটি বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে হৃদয়কে ফাঁকা জায়গায় নিয়ে যাওয়ার ঘটনা, সেখানে কারা উপস্থিত ছিলেন, ছুরিকাঘাতের সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত এবং ঘটনার পর অভিযুক্তরা কোথায় চলে যান—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
এদিকে প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের খবর জানাজানি হওয়ার পর নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। তবে তারা একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা আদালতের সামনে তুলে ধরার প্রত্যাশাও রয়েছে তাদের।
হৃদয় হত্যার এই ঘটনা ব্যক্তিগত বিরোধ কীভাবে দ্রুত সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, তার একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে সামনে এসেছে। সামান্য একটি বিরোধের জেরে একজন মানুষের প্রাণহানি এবং একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন থমকে যাওয়া স্থানীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা ও সামাজিক সহাবস্থানের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার করা হলেও মামলার তদন্ত এখনো চলমান। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা, হত্যার সময়কার পরিস্থিতি এবং ব্যবহৃত অস্ত্রসহ বিভিন্ন বিষয় তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার কথা রয়েছে। নিহতের পরিবার ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
এখন মামলার পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে উপস্থাপন, তদন্তের অগ্রগতি এবং অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের দিকে নজর থাকবে। একই সঙ্গে তদন্তের মাধ্যমে হৃদয় কুমার হরিজন হত্যাকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ কারণ ও ঘটনার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট হবে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।


