প্রকাশ: ০২ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় গুরুতর আহত জাহাঙ্গীর আলম (২৯) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রোববার বিকেলে কমলগঞ্জ পৌরসভার বড়গাছ গ্রামে হামলার শিকার হওয়ার পর আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। একই ঘটনায় জাহাঙ্গীরের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম জসিমও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
নিহত জাহাঙ্গীর আলম বড়গাছ গ্রামের উম্মর মিয়ার ছেলে। মাত্র ২৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে পরিবারে নেমে এসেছে গভীর শোক। স্বজনদের ভাষ্য, জাহাঙ্গীর ছিলেন পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী ও মাত্র ১৪ মাস বয়সী সন্তান শুভ এখন স্বজনদের সান্ত্বনায় দিন কাটাচ্ছেন। ছোট্ট শিশুটি হয়তো এখনো বুঝতে পারেনি বাবাকে আর ফিরে পাওয়া যাবে না। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকার পরিবেশ।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার রামপাশা গ্রামের যুক্তরাজ্যপ্রবাসী রিপন আহমেদের জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে কয়েকজনের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। জমি বিক্রির বিষয়ে মধ্যস্থতার সঙ্গে জাহাঙ্গীর ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা যুক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে। এ নিয়ে একই এলাকার মৃত রশিদ মিয়ার ছেলে মাহমুদ মিয়া (৩৫), মামুন মিয়া (৩০) ও ময়দুল হক ওরফে ময়ুনুল হকের (২৮) সঙ্গে তাঁদের বিরোধ তৈরি হয়।
রোববার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে জাহাঙ্গীরের চাচাতো ভাই সাহেল জমি কেনার উদ্দেশ্যে দুজন ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে বড়গাছ এলাকায় আসেন। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে তিনি জাহাঙ্গীরের বড় ভাই জহিরুল ইসলাম জসিমকে সেখানে ডেকে আনেন। জসিম ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর জমি বিক্রির বিষয়টি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি শুরু হয়। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জানা গেছে।
পরিবারের অভিযোগ, বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন জসিমের ওপর হামলা চালায়। তাঁর মাথায় আঘাত করার পাশাপাশি দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করা হয়। এ সময় ছোট ভাই জাহাঙ্গীর আলম হামলার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাঁকে দেখেও হামলাকারীরা আক্রমণ চালায় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে। জাহাঙ্গীরের মাথায় গুরুতর আঘাত করা হয় এবং তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে যান।
ঘটনার পর স্থানীয় লোকজন দ্রুত এগিয়ে এসে দুই ভাইকে উদ্ধার করেন। প্রথমে তাঁদের স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে জাহাঙ্গীরের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চিকিৎসকেরা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত রোববার দিবাগত রাত দুইটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর বড় ভাই জসিমও গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটি জমি বিক্রিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিল, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা আলোচনা চলছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা বলে দাবি করা হয়েছে। তবে হামলার প্রকৃত কারণ, কারা কীভাবে এতে জড়িত এবং ঘটনার পেছনে অন্য কোনো বিরোধ ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
নিহতের চাচা সুন্দর আলী অভিযোগ করেছেন, জাহাঙ্গীর ও তাঁর ভাইয়ের ওপর হামলাটি আকস্মিক ছিল না; বরং আগে থেকেই পরিকল্পনা করে হামলা চালানো হয়েছে। তাঁর দাবি, হামলায় ব্যবহারের জন্য দা ও লাঠিসহ দেশীয় অস্ত্র আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মামুন, মাহমুদ ও ময়ুনুল—তিন ভাই এবং তাঁদের ভাগনে সামি ও ভগ্নিপতি খয়ের মিলে দুই ভাইয়ের ওপর হামলা চালান। ঘটনার পর অভিযুক্তদের পরিবারের সদস্যদের অনেকে বাড়িতে নেই বলেও তিনি দাবি করেছেন।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকেও ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কথা জানানো হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, জমি বিক্রির বিরোধের পাশাপাশি কয়েক দিন আগে গ্রামের একটি মাদ্রাসাসংক্রান্ত বিষয় নিয়েও হামলার শিকার পরিবারের সঙ্গে অভিযুক্তদের বিরোধ তৈরি হয়েছিল। ফলে হামলার পেছনে একাধিক বিরোধের ভূমিকা ছিল কি না, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
ঘটনার পর থেকেই বড়গাছ গ্রামসহ আশপাশের এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একজন তরুণের আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে যেমন শোক নেমে এসেছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, জমি, পারিবারিক বিষয় কিংবা অন্য কোনো বিরোধের জেরে সংঘাত তৈরি হলেও তা যেন কোনোভাবেই প্রাণহানির পর্যায়ে না যায়। সামান্য বিরোধের পরিণতিতে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে—জাহাঙ্গীরের মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।
বিশেষ করে নিহতের ১৪ মাস বয়সী সন্তান শুভকে ঘিরে স্বজনদের মধ্যে গভীর বেদনা তৈরি হয়েছে। বাবার মৃত্যুর অর্থ বোঝার বয়স এখনো হয়নি শিশুটির। অথচ তার শৈশবের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন মানুষ আর কখনো তাকে কোলে তুলে নিতে পারবেন না। জাহাঙ্গীরের বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পারিবারিক পরিবেশ।
এ ঘটনায় নিহতের বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। কমলগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল উদ্দিন জানান, ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে ময়ুনুল হক নামের একজনকে আটক করা হয়েছে। অন্য অভিযুক্তদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, ঘটনার সঙ্গে কারা জড়িত এবং হামলার প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে নিহতের পরিবারের অভিযোগ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
একজন তরুণের মৃত্যুতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—একটি জমি বিক্রির বিরোধ কীভাবে এমন রক্তক্ষয়ী ঘটনায় পরিণত হলো। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তদন্তের দিকে তাকিয়ে আছে নিহতের পরিবার ও স্থানীয় মানুষ। পাশাপাশি আহত জহিরুল ইসলাম জসিমের দ্রুত সুস্থতার জন্যও উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। পরিবারের প্রত্যাশা, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা হবে এবং আইন অনুযায়ী তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জাহাঙ্গীরের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি পরিবারের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে, তা কোনো বিচারেই পূরণ হওয়ার নয়। তবে স্বজনদের প্রত্যাশা, তাঁর মৃত্যুর কারণ ও হামলার সঙ্গে জড়িতদের বিষয়ে দ্রুত সত্য উদঘাটিত হবে। একই সঙ্গে জমি বা ব্যক্তিগত বিরোধকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো পরিবারকে এমন শোকের মুখোমুখি হতে না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।


