প্রকাশ: ০৩ অক্টোবর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হাম পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। হামের উপসর্গ নিয়ে প্রতিদিনই নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। একদিকে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ, অন্যদিকে বছরের শুরু থেকে হামে আক্রান্ত ও হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে ১৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
একই সময়ে বিভাগে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮১ জনে। এর বাইরে হামের উপসর্গ নিয়ে বিপুলসংখ্যক রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৫৮ জন সন্দেহজনক হামের রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ফলে সিলেট বিভাগের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬৬১ জনে।
স্বাস্থ্য বিভাগের এই পরিসংখ্যান সিলেট অঞ্চলে হাম পরিস্থিতির ব্যাপকতা নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় চিকিৎসাসেবা পরিচালনা নিয়েও তৈরি হচ্ছে বাড়তি চাপ। আক্রান্তদের মধ্যে শিশুদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগের হয়ে উঠেছে। অনেক পরিবারকে সন্তানকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটতে হচ্ছে, আবার কোনো কোনো পরিবারকে দীর্ঘ সময় হাসপাতালে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৬৬১ রোগীর মধ্যে ৩৭২ জনই ভর্তি আছেন সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অর্থাৎ বিভাগে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি মোট রোগীর অর্ধেকেরও বেশি রোগী এককভাবে এই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এতে বোঝা যায়, বিভাগের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রটির ওপর রোগীর চাপ কতটা বেড়েছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যেও ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। এ সময়ে সেখানে ৬০ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, যেখানে ৬৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ২৫ জন, মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ৮ জন এবং রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একজন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
শুধু সিলেট জেলার হাসপাতালগুলোতেই বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৫৩৯ জন। এর মধ্যে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩৭২ জন এবং শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৪০ জন চিকিৎসাধীন। এছাড়া রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ৪ জন, পার্কভিউ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন এবং উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৩ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
রোগীর এই সংখ্যা হাসপাতালগুলোর জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী ভর্তি হলে শয্যা, চিকিৎসক, নার্স, ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে রোগীদের পৃথকভাবে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন থাকায় ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
চলতি বছরের শুরু থেকে সিলেট বিভাগে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্তের সংখ্যাও ধীরে ধীরে বেড়েছে। ১ জানুয়ারি থেকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত বিভাগে মোট ১ হাজার ৮১ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪০৮ জন। সুনামগঞ্জে আক্রান্তের সংখ্যা ৩৫৭ জন। হবিগঞ্জে ১৫৮ জন এবং মৌলভীবাজারেও ১৫৮ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছেন।
জেলাভিত্তিক এই পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, সিলেট ও সুনামগঞ্জে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। তবে চার জেলাতেই রোগী শনাক্ত হওয়ায় এটি শুধু কোনো একটি জেলার বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। পুরো বিভাগেই রোগের বিস্তার এবং চিকিৎসার চাপ নিয়ে স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তবে সর্বশেষ প্রতিবেদনের দিনে নতুন করে কোনো রোগী নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হননি। তারপরও সন্দেহজনক রোগী হিসেবে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার সংখ্যা কমেনি। এর অর্থ, উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা এখনো উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে রয়েছে। নিশ্চিত সংক্রমণের সংখ্যা ও সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যার মধ্যে পার্থক্য থাকলেও হাসপাতালগুলোর ওপর তাৎক্ষণিক চিকিৎসা চাপ তৈরির ক্ষেত্রে উভয় শ্রেণির রোগীর উপস্থিতিই গুরুত্বপূর্ণ।
হামের মতো সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। অসুস্থ শিশুকে বাড়িতে রেখে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা বা নিজের মতো করে ওষুধ দেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়ে।
সিলেটের বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর চাপ বৃদ্ধির চিত্রের সঙ্গে মৃত্যুর পরিসংখ্যানও গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। বছরের নয় মাসে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত সংক্রমণ মিলিয়ে ১৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে। প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের স্বজন হারানোর বেদনা। বিশেষ করে কোনো শিশু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যদের জন্য সেই সময়টি অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে।
হামের প্রকোপের মধ্যে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি জনসচেতনতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রোগের উপসর্গ সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে যথাযথভাবে চিকিৎসার আওতায় আনা এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে অভিভাবকদের সতর্ক থাকাও জরুরি।
সিলেট বিভাগের বর্তমান পরিস্থিতি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং একই সময়ে বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসাধীন থাকার কারণে হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ অব্যাহত রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে রোগীর সংখ্যা আরও বাড়লে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৮১ জন এবং মৃত্যু ১৮২ জনে পৌঁছানোয় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। একই সঙ্গে ৬৬১ জন রোগী বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় পরিস্থিতি যে এখনো স্বাভাবিক হয়নি, সেটিও স্পষ্ট। বিশেষ করে একদিনে ১৫৮ জন নতুন রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার কারণ তৈরি করেছে।
সিলেটের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাধীন রোগীদের মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবেন—এটাই স্বজনদের প্রত্যাশা। কিন্তু একই সঙ্গে নতুন করে রোগী ভর্তি হওয়া অব্যাহত থাকলে হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা ধরে রাখা একটি বড় বিষয় হয়ে দাঁড়াবে। তাই আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনার পাশাপাশি রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।
হামের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। হাসপাতাল পর্যায়ে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ, পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে। কোনো পরিবার যেন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পেতে দেরি না করে এবং অসুস্থ শিশু বা রোগীকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া হয়, সে বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন।
সিলেট বিভাগের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান তাই শুধু কিছু সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শত শত পরিবারের উদ্বেগ, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অসংখ্য রোগীর জীবনযুদ্ধ এবং স্বজনদের উৎকণ্ঠা। ১৮২ জনের মৃত্যু এবং ১ হাজার ৮১ জন নিশ্চিত আক্রান্তের তথ্য পরিস্থিতির গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিয়েছে। এখন রোগীর চাপ কমানো, চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর করা এবং হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়াই সংশ্লিষ্ট সবার জন্য বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।


