প্রকাশ: ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের মৃত্যুর ঘটনায় করা আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলায় দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে শুনানি শেষে তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেওয়া হয়।
মামলাটির তদন্তভার বর্তমানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে। দ্বিতীয় দফার রিমান্ড শেষে তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির তেজগাঁও জোনের পরিদর্শক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আদালতে যে আবেদন দিয়েছেন, তাতে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া বিভিন্ন তথ্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে মরিয়মের ন্যাম ভবনে থাকার ব্যবস্থা নিয়েও তথ্য রয়েছে। তবে এসব তথ্য তদন্তের অংশ এবং আদালতে উপস্থাপিত তদন্ত কর্মকর্তার বক্তব্য; এগুলো এখনো আদালতের চূড়ান্ত রায়ে প্রমাণিত ঘটনা নয়।
আদালতে তদন্ত কর্মকর্তা জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সঙ্গে মরিয়মের সম্পর্ক, বিয়ে এবং ন্যাম ভবনে তাঁদের বসবাসের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন। তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গাজী নজরুল প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে নিয়ে ন্যাম ভবনের বাসায় থাকতেন। সেখানে মরিয়মও থাকতেন এবং কখনো কখনো তাঁকে শয়নকক্ষের পাশের বারান্দায় রাত কাটাতে হতো বলে তদন্ত আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিমান্ডে পাওয়া তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
মরিয়মের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে করা মামলাটির তদন্তে এখন মূলত ঘটনার আগে তাঁর সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের আচরণ, পারিবারিক সম্পর্ক, বিয়ের প্রেক্ষাপট এবং মৃত্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পরিস্থিতিগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে আসামিদের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের বক্তব্য এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করছে তদন্ত সংস্থা।
ঘটনাটি সামনে আসে ২০ সেপ্টেম্বর। ওই দিন রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাটে মরিয়মের মৃত্যুর খবর পায় পুলিশ। পরে গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে হেফাজতে নেওয়া হয়। পরদিন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে গাজী নজরুল ইসলাম, মাকছুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করে মামলা করেন। পরে মামলাটির তদন্তভার ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মামলায় গাজী নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রথম দফায় চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। পরে ২৪ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় দফায় আরও চার দিনের রিমান্ড দেওয়া হয়। দুই দফার রিমান্ড শেষে সোমবার তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে রাখার আবেদন করেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষ জামিনের আবেদন করে। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত জামিন আবেদন নামঞ্জুর করে তাঁকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকেও মামলার আসামি করা হয়েছে। প্রথম দফায় তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল এবং পরে আদালতের আদেশে কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার তৃতীয় আসামি ওবায়দুর রহমানকেও পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ফলে তদন্তের পরিধি এখন শুধু গাজী নজরুলকে ঘিরে নয়; মামলায় অভিযুক্ত অন্য ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়েও তদন্ত চলছে।
তদন্তের এই পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে, মরিয়মের মৃত্যুর আগে তাঁর পারিবারিক ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি কী ছিল এবং মামলায় যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ পাওয়া যায়। পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, রিমান্ডে গাজী নজরুলের কাছ থেকে ঘটনার বিষয়ে আরও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্তে পাওয়া তথ্য আদালতে উপস্থাপন এবং সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের পরই মামলার পরবর্তী আইনি অবস্থান স্পষ্ট হবে।
এদিকে গাজী নজরুল ইসলামের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও গত কয়েক মাসে বড় পরিবর্তন এসেছে। জুলাইয়ে তাঁকে জামায়াতে ইসলামী দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দলটির পক্ষ থেকে অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর তাঁর বিরুদ্ধে ‘নৈতিক স্খলন’-এর অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার কথা জানিয়ে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়েছিল। পরে দলটি সংসদ সচিবালয় ও নির্বাচন কমিশনকেও বিষয়টি জানায়।
তবে দল থেকে বহিষ্কারের পর তাঁর সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে কি না, তা নিয়ে আলাদা সাংবিধানিক ও আইনগত প্রশ্ন তৈরি হয়। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, শুধু দল থেকে বহিষ্কারের ভিত্তিতে কমিশনের তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই এবং সংসদ থেকে সংশ্লিষ্ট কোনো রেফারেন্স এলে বিষয়টি পরীক্ষা করা হতে পারে। সেপ্টেম্বরের ২১ তারিখ পর্যন্ত গাজী নজরুলের সংসদ সদস্য পদ নিয়ে স্পিকারের কাছ থেকে কমিশন কোনো চিঠি পায়নি বলে ইসি সচিব জানিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিতর্কের সেই অধ্যায়ের মধ্যেই মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে গাজী নজরুলকে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করেছে। ফলে একদিকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন, অন্যদিকে চলমান ফৌজদারি মামলার তদন্ত—দুটি পৃথক বিষয় একই সময়ে আলোচনায় এসেছে। আইনগতভাবে কোন অভিযোগের কী পরিণতি হবে, তা নির্ধারণ করবে তদন্তের ফলাফল এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া।
মরিয়মের পরিবার আত্মহত্যায় প্ররোচনার যে অভিযোগ এনেছে, সেটি এখন তদন্তাধীন। অন্যদিকে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনো আদালত দেয়নি। তাই মামলার প্রতিটি তথ্যকে তদন্তের অগ্রগতি ও আদালতের কার্যক্রমের আলোকে দেখা গুরুত্বপূর্ণ।
একজন তরুণীর মৃত্যুকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই মামলায় শুধু আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ নয়, ঘটনার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটও নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধানের প্রয়োজন রয়েছে। পরিবারের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, নথিপত্র এবং তদন্তে পাওয়া অন্যান্য প্রমাণ—সবকিছুর সমন্বিত মূল্যায়নের মাধ্যমেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
এখন গাজী নজরুল ইসলাম কারাগারে রয়েছেন এবং মামলার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে ডিবি। তদন্তে আরও কী তথ্য উঠে আসে, আদালতে সেগুলোর কী মূল্যায়ন হয় এবং মামলার পরবর্তী শুনানিতে কী সিদ্ধান্ত আসে—সেদিকেই নজর রয়েছে। একই সঙ্গে মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছেন তাঁর পরিবার ও সংশ্লিষ্টরা। তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে অভিযোগগুলোর আইনগত পরিণতি।

