প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা একটি মামলায় সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট খায়রুল কবির রুমেনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা তাকে সুনামগঞ্জ সদর থানায় নিয়ে যাওয়ার পর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। মামলাটিতে তাকে এজাহারভুক্ত আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
খায়রুল কবির রুমেন সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তিনি এর আগে সুনামগঞ্জের সরকারি কৌঁসুলি বা পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আইনজীবী ও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সদর থানায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় রুমেনকে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলার বিষয়ে বার নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে মঙ্গলবার বিকেলে তিনি আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ে যান। সেখানে যাওয়ার পর আশপাশে সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের অবস্থান দেখতে পান আইনজীবী নেতারা।
আব্দুল হামিদ বলেন, বিষয়টি বুঝতে পেরে বারের সদস্য হিসেবে রুমেনকে নিজেরাই থানায় নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর রুমেনকে সুনামগঞ্জ সদর থানায় নিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। আইনজীবী সমিতির সভাপতির ভাষ্য, তারা ‘আইনের প্রতি সম্মান দেখিয়ে’ এই পদক্ষেপ নিয়েছেন।
পুলিশের পক্ষ থেকেও রুমেনের বিরুদ্ধে করা মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সদর থানার এসআই অভিজিৎ ভৌমিক জানান, ১৮ সেপ্টেম্বর দায়ের করা মামলায় রুমেন ৬৩ নম্বর আসামি। ওই মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এর আগে ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে করা আরেকটি মামলাতেও তাঁর নাম রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
জেলা পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিলের পর নাশকতার চেষ্টার অভিযোগে ১৮ সেপ্টেম্বর মামলাটি করা হয়। ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের একজন হিসেবে খায়রুল কবির রুমেনের নাম রয়েছে বলে তিনি জানান।
মামলার অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে ভিন্ন ভিন্ন ভাষ্য পাওয়া গেলেও, রুমেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এখনো আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার বিষয়। ফলে মামলায় আসামি হওয়া বা গ্রেপ্তারকে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া।
রুমেনের আইনজীবী পরিচয় ও জেলা আইনজীবী সমিতির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পৃক্ততার কারণে ঘটনাটির আরেকটি দিকও আলোচনায় এসেছে। একজন সাবেক পিপি ও আইনজীবী হিসেবে তিনি যে সংগঠনের সদস্য, সেই সংগঠনের নেতারাই তাকে থানায় নিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছেন। আইনজীবী সমিতির সভাপতি এটিকে আইনের প্রতি সম্মান দেখানোর পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
স্থানীয় আইনজীবী মহলের জন্যও ঘটনাটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, রুমেন নিজেও একসময় জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলার পর সমিতির কার্যালয়ে তাঁর উপস্থিতি এবং সেখান থেকে নেতাদের মাধ্যমে থানায় যাওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় আইনজীবীদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বরের মামলায় রুমেন ছাড়াও আরও আসামি রয়েছেন। আইনজীবী ক্লাব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে মামলায় ৬৩ জনের নাম উল্লেখ এবং আরও ১৫ থেকে ২০ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করার কথা বলা হয়েছে। তবে মামলার সব অভিযোগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ্যে না আসায় তদন্তের অগ্রগতি না হওয়া পর্যন্ত সেগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
রুমেনের বিরুদ্ধে আগে করা আরেকটি মামলার কথাও পুলিশ জানিয়েছে। ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ওই মামলায় তাঁর নাম আসে। তবে সেই মামলায় তাঁর বর্তমান আইনি অবস্থার বিষয়ে মঙ্গলবারের গ্রেপ্তারের সঙ্গে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য পুলিশ প্রকাশ করেনি।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় থানায় নেওয়ার পর নাশকতার মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এখন মামলার তদন্তে পুলিশ কী তথ্য পায় এবং পরবর্তী সময়ে আদালতে এ বিষয়ে কী ধরনের কার্যক্রম হয়, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। আইন অনুযায়ী, অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে মামলার পরবর্তী গতিপথ।
সুনামগঞ্জে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মামলা ও আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত ঘটনা স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা বা গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ, পুলিশের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। রুমেনের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পরিচয় এবং মামলার অভিযোগ—এই তিনটি বিষয়কে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।
এদিকে জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা জানিয়েছেন, তারা রুমেনকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছেন আইনগত প্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়ে। পুলিশ জানিয়েছে, ১৮ সেপ্টেম্বরের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এখন তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ঘটনাটিকে ঘিরে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক ও পেশাজীবী মহলে আলোচনা অব্যাহত থাকলেও মামলার প্রকৃত চিত্র জানতে তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত রুমেনকে মামলার আসামি হিসেবেই উল্লেখ করা হচ্ছে।


