প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলকে ‘পুনরুদ্ধার’ করার সময় এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। পাকিস্তাননিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর পুনরুদ্ধারের দাবির পাশাপাশি বাংলাদেশের এই তিন অঞ্চল নিয়েও তাঁর এমন বক্তব্য ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড, দেশভাগ এবং আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত ভূখণ্ড নিয়ে ভারতের একজন ক্ষমতাসীন দলের সংসদ সদস্যের এমন মন্তব্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক বক্তব্যে নিশিকান্ত দুবে বলেন, শুধু পাকিস্তানের কাছ থেকে পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর পুনরুদ্ধার করাই যথেষ্ট নয়, নেহরুর সময়ে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি যে ভূখণ্ডগুলোকে দাবি করছেন, সেগুলোও পুনরুদ্ধারের সময় এসেছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বাংলাদেশের নোয়াখালী, সিলেট এবং চট্টগ্রাম বন্দরের নাম উল্লেখ করেন।
দুবে তাঁর বক্তব্যে ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুকে দায়ী করে বলেন, ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের সময় মুসলিম লীগের সমর্থন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নেহরু এসব অঞ্চল পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হিসেবে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তাঁর দাবি, তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত এসব অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে স্থানীয় রাজপরিবারের মতামত যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি।
এএনআইকে দেওয়া বক্তব্যে দুবে বলেন, তাঁর দৃষ্টিতে এখন শুধু পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর পুনরুদ্ধারের সময় নয়; নেহরু যেসব ভূখণ্ড পাকিস্তানের হাতে তুলে দিয়েছিলেন বলে তিনি মনে করেন, সেগুলো নিয়েও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। এ ক্ষেত্রে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেটের নাম উল্লেখ করে তিনি তাঁর দাবির পক্ষে ঐতিহাসিক যুক্তি তুলে ধরেন।
বিজেপি সংসদ সদস্যের এই বক্তব্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন ত্রিপুরার প্রয়াত রাজপরিবারের বংশধর এবং তিপ্রা মথা পার্টির প্রধান প্রদ্যোত মাণিক্য। তিনি দুবের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে দাবি করেন, দেশভাগের সময় তাঁর ঠাকুমাকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল অংশ পূর্ব পাকিস্তানের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁর মতে, এটি ত্রিপুরার ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অধ্যায়।
প্রদ্যোত মাণিক্য দীর্ঘদিন ধরেই ত্রিপুরার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, ঐতিহাসিক পরিচয় এবং রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে কথা বলে আসছেন। এবার তাঁর বক্তব্যে দেশভাগের সময়কার ভূখণ্ড বণ্টনের বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি মনে করেন, তৎকালীন সিদ্ধান্তের কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক যোগাযোগব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়েছে।
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগের ক্ষেত্রে শিলিগুড়ি করিডোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরু এই স্থলপথটি সাধারণভাবে ‘চিকেনস নেক’ নামে পরিচিত। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর সঙ্গে ভারতের মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ অনেকাংশে এই করিডোরের ওপর নির্ভরশীল। প্রদ্যোত মাণিক্যের দাবি, চট্টগ্রাম বন্দরে ভারতের সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থান অনেক বেশি সুবিধাজনক হতে পারত।
তিনি বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোকে সমুদ্রপথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত রাখার পেছনে দেশভাগের সময়কার সিদ্ধান্তের ভূমিকা রয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে সরাসরি প্রবেশাধিকার থাকলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে শিলিগুড়ি করিডোর নিয়ে এতটা উদ্বিগ্ন থাকতে হতো না।
নিশিকান্ত দুবে আরও দাবি করেন, ১৯৪৬ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে নেহরু মুসলিম লীগের সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, এই রাজনৈতিক সমীকরণ সামলাতে গিয়ে তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মাণিক্যের আপত্তিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। দুবের ভাষ্য অনুযায়ী, মহারাজা বারবার প্রশ্ন তুলেছিলেন, তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কীভাবে অন্যরা নিতে পারে।
দুবের বক্তব্যে মহারাজার আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরে বলা হয়, নোয়াখালী কীভাবে পাকিস্তানের হাতে দেওয়া যায়, সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোট কীভাবে আয়োজন করা যায় এবং চট্টগ্রামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার কার—এসব প্রশ্ন নিয়ে তিনি নেহরুর সঙ্গে বিরোধে জড়িয়েছিলেন। মহারাজার অবস্থান ছিল, তাঁর রাজ্যের কোনো ভূখণ্ড ভারত, পাকিস্তান নাকি স্বাধীন রাষ্ট্রের অংশ হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁরই থাকা উচিত।
তবে দুবের এই ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারতের দেশভাগের সময় সিলেটের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই গণভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে পড়ে এবং সিলেটের অধিকাংশ এলাকা পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হয়। অন্যদিকে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম ছিল অবিভক্ত বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত জেলা। ফলে এসব অঞ্চলকে সরাসরি তৎকালীন ত্রিপুরা দেশীয় রাজ্যের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করার দাবি ঐতিহাসিকভাবে বিতর্কিত। দেশভাগের সময়কার প্রশাসনিক সীমানা, দেশীয় রাজ্যগুলোর অবস্থান এবং বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে আলাদা করে বিবেচনা করা প্রয়োজন
প্রদ্যোত মাণিক্যও তাঁর বক্তব্যে দেশভাগের সময়কার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতির প্রসঙ্গ সামনে এনেছেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড ও সমুদ্রপথের প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন করে আলোচনা বা সমঝোতার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ভারত সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বলে তিনি মনে করেন। তাঁর বক্তব্যে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গও উঠে এসেছে।
প্রদ্যোত মাণিক্যের এই অবস্থান মূলত বৃহত্তর তিপ্রাল্যান্ড আন্দোলনের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। ত্রিপুরার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক পরিচয়, ভূমির অধিকার, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দাবিকে কেন্দ্র করে এ আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্যে দেশভাগের ইতিহাসকে বর্তমান রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা স্পষ্ট।
অন্যদিকে নিশিকান্ত দুবের বক্তব্যে বাংলাদেশের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলকে পুনরুদ্ধারের কথা বলা হলেও এ ধরনের বক্তব্যের বাস্তবতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ বাংলাদেশ বর্তমানে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশটি স্বাধীনতা অর্জন করেছে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ভূখণ্ড ও সীমানা নিয়ে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির একতরফা ঐতিহাসিক দাবি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আইনি প্রভাব ফেলে না।
বিশেষ করে সিলেট বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ। চট্টগ্রাম দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার। আর নোয়াখালী দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। এই তিন অঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ইতিহাস, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, জনপদ এবং জাতীয় পরিচয়ের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই এসব অঞ্চলকে অন্য কোনো দেশের পুনরুদ্ধারযোগ্য ভূখণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই স্পর্শকাতর বিষয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্ব শুধু বাংলাদেশের অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে, পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও যোগাযোগ সুবিধা বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পণ্য পরিবহন, আমদানি-রপ্তানি এবং সমুদ্রবন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
সেই বাস্তবতায় চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে রাজনৈতিক পুনরুদ্ধারের বক্তব্যের পরিবর্তে পারস্পরিক সম্মান, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক আইন মেনে অর্থনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, যোগাযোগব্যবস্থা এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা উভয় দেশের জন্যই প্রয়োজনীয়।
নিশিকান্ত দুবের বক্তব্যের পর এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিবেশী দেশের ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যের এমন মন্তব্য আঞ্চলিক রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যে এমন দাবি দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, দেশভাগের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা, ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা কিংবা কোনো জনগোষ্ঠীর অতীত অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক গণতান্ত্রিক পরিসরে চলতে পারে। কিন্তু সেই বিতর্কের সঙ্গে অন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের দাবি যুক্ত হলে তা আঞ্চলিক সম্পর্কের জন্য সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে নিশিকান্ত দুবে ও প্রদ্যোত মাণিক্যের বক্তব্যে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, তৎকালীন ত্রিপুরা রাজপরিবারের অবস্থান, সিলেটের গণভোট এবং চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত গুরুত্ব আবারও আলোচনায় এসেছে। তবে ইতিহাসের ব্যাখ্যা নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা একটি প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। প্রতিবেশী দুই দেশের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক নির্ভর করবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্বশীল রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর।


