প্রকাশ: ০৭ নভেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, চলমান সংস্কারকাজের গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের নাগরিক দুর্ভোগ কমানোর লক্ষ্যে গভীর রাতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প পরিদর্শন করেছেন শিল্প, বাণিজ্য, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। শুক্রবার গভীর রাতে নগরীর কুশিঘাট ও উপশহর এলাকার সড়ক উন্নয়নকাজ সরেজমিনে ঘুরে দেখেন তিনি। এ সময় কাজের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপস না করার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের কঠোর নির্দেশনা দেন মন্ত্রী।
নগরীর সড়ক উন্নয়ন নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। প্রতিদিন কর্মস্থলে যাওয়া, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো, ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা কিংবা জরুরি প্রয়োজনে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত—সব ক্ষেত্রেই সড়ক যোগাযোগের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু সড়কের ভাঙাচোরা অবস্থা, সংস্কারকাজে দীর্ঘসূত্রতা, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং যান চলাচলে বিঘ্ন নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনে বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে চলমান উন্নয়নকাজের অগ্রগতি ও গুণগত মান সরাসরি পর্যবেক্ষণে মন্ত্রীর রাতের এই পরিদর্শনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শুক্রবার গভীর রাতে মন্ত্রী প্রথমে নগরীর কুশিঘাট এলাকায় যান। সেখানে আধুনিক প্রযুক্তির এসফল্ট ব্যবহার করে সড়ক সংস্কার ও কার্পেটিংয়ের কাজ চলছিল। তিনি কাজের বিভিন্ন পর্যায় পর্যবেক্ষণ করেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রকল্পের অগ্রগতি, ব্যবহৃত উপকরণ ও বাস্তবায়নপ্রক্রিয়া সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। এ সময় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, উন্নয়নকাজের ক্ষেত্রে গুণগত মান শতভাগ বজায় রাখতে হবে। শুধু কাজ শেষ করাই যথেষ্ট নয়, বরং সড়কটি যেন দীর্ঘদিন ব্যবহারযোগ্য থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।
মন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ ব্যয়ে বাস্তবায়িত প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম, অবহেলা কিংবা নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে না বলে সতর্ক করেন। উন্নয়নকাজের মান নিয়ে কোনো আপস করা হবে না—এমন কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় থাকার বিষয়টিও স্মরণ করিয়ে দেন।
সড়ক নির্মাণ ও সংস্কারকাজে উপকরণের মান, কারিগরি নির্দেশনা অনুসরণ এবং যথাযথ তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নগরীর ব্যস্ত সড়কে কাজ করার সময় নির্মাণের মানের পাশাপাশি যানবাহন ও পথচারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হয়। নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার কিংবা যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করলে নতুন করে সংস্কার করা সড়কও অল্প সময়ের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নাগরিকদের দুর্ভোগও আবার ফিরে আসে। এ কারণে কাজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিয়মিত তদারকি এবং প্রকৌশলগত মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী।
পরিদর্শনকালে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বর্তমান সরকার টেকসই ও জনকল্যাণমুখী উন্নয়নে বিশ্বাসী। জনগণের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে দেশজুড়ে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে নগরীর যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, নিরাপদ ও যুগোপযোগী করে তুলতে সরকার কাজ করছে। এ লক্ষ্যে শিগগিরই সিলেটে বেশ কয়েকটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
মন্ত্রীর বক্তব্যে নগরীর ভবিষ্যৎ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সিলেট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী। পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং প্রবাসী পরিবারের সঙ্গে নগরটির যোগাযোগ রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন প্রয়োজনে নগরীতে যাতায়াত করেন। ফলে সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন শুধু যান চলাচল সহজ করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে নগর অর্থনীতি, নাগরিক সেবা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানও সরাসরি জড়িত।
কুশিঘাটের কাজ পরিদর্শন শেষে মন্ত্রী নগরীর উপশহর এলাকায় যান। সেখানে এসফল্ট দিয়ে নির্মিত সড়কে ট্রাফিক সিগন্যাল ও রোড মার্কিংয়ের কাজ পর্যবেক্ষণ করেন। সড়কের সামগ্রিক অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট কাজের অগ্রগতি দেখে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে নগরবাসীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে ট্রাফিক সিগন্যাল ও রোড মার্কিংয়ের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দেন।
সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি কার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাও নগরীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সড়কে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মোড় ও সংযোগস্থলে যানজটের চাপ তৈরি হয়। যথাযথ ট্রাফিক সিগন্যাল, স্পষ্ট রোড মার্কিং এবং সুশৃঙ্খল যান চলাচলের ব্যবস্থা না থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে পথচারী, শিক্ষার্থী, বয়স্ক মানুষ ও শিশুদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য সড়কের নির্দেশনামূলক চিহ্ন এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার যথাযথ বাস্তবায়ন প্রয়োজন। উপশহর এলাকায় এসব কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশনার মধ্য দিয়ে নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
নগরীর সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাজের গতি ও মান—দুই বিষয়ই সমান গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় সড়ক সংস্কারের কারণে সাময়িকভাবে যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল এবং বিভিন্ন কর্মস্থলে যাতায়াতকারী মানুষকে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়। তাই উন্নয়নকাজের সময়সূচি যথাযথভাবে অনুসরণ করা এবং নির্মাণকাজের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ যতটা সম্ভব কমিয়ে রাখা প্রয়োজন। দ্রুত কাজ শেষ করার পাশাপাশি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার দায়িত্বও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায়।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় প্রশাসন, সিটি করপোরেশন, প্রকৌশল বিভাগ এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। প্রকল্পের প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত নকশা ও কারিগরি শর্ত অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, ব্যবহৃত উপকরণের মান যথাযথ কি না এবং কাজের অগ্রগতি পরিকল্পনা অনুযায়ী হচ্ছে কি না—এসব বিষয় নিয়মিত যাচাই করা জরুরি। শুধু পরিদর্শনের সময় নয়, প্রকল্পের পুরো সময়জুড়ে তদারকি অব্যাহত থাকলে উন্নয়নকাজের স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা বাড়ানো সম্ভব।
পরিদর্শনকালে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রজি উদ্দিন খান ও শামসুল হক পাটোয়ারী, নির্বাহী প্রকৌশলী সুমন চন্দ্র দেবসহ বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা চলমান কাজের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে মন্ত্রীকে অবহিত করেন।
মন্ত্রীর এই আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে চলমান সড়ক উন্নয়নকাজের মান ও সময়সীমা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রতি সরকারের প্রত্যাশা স্পষ্ট হয়েছে। তবে নগরবাসীর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এসব নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন কতটা নিশ্চিত করা যায়। কাজের মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ হলে সাধারণ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় কমানো এবং যান চলাচল আরও স্বাভাবিক করার সুযোগ তৈরি হবে।
সিলেটের নাগরিকদের প্রত্যাশা, চলমান সংস্কারকাজ কেবল সাময়িক সৌন্দর্যবর্ধন বা স্বল্পমেয়াদি উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং নগরীর সামগ্রিক যোগাযোগব্যবস্থাকে আরও টেকসই করে তুলবে। নতুন সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি পুরোনো সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা, নিরাপদ ফুটপাত এবং আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার দিকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে তুলতে বিচ্ছিন্ন কিছু সড়ক সংস্কারের চেয়ে সমন্বিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন বেশি কার্যকর।
গভীর রাতে মন্ত্রীর সরেজমিন পরিদর্শন তাই কেবল চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি উন্নয়নকাজের মান নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীলতার বার্তা দেওয়ার একটি পদক্ষেপ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। এখন নগরবাসীর প্রত্যাশা, দেওয়া নির্দেশনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সিলেটের সড়কগুলো নিরাপদ, টেকসই ও চলাচলবান্ধব হয়ে উঠবে এবং দীর্ঘদিনের যাতায়াত দুর্ভোগ ধীরে ধীরে কমে আসবে।


