প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
আকাশপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রে যাত্রীদের প্রথম প্রত্যাশাগুলোর একটি নিরাপত্তা। বিমানবন্দরের প্রবেশদ্বার থেকে উড্ডয়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা শুধু যাত্রীদের আস্থা নয়, আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। সেই জায়গায় নতুন করে ইতিবাচক নজর কেড়েছে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট ফর ট্রান্সপোর্টের (ডিএফটি) সাম্প্রতিক এভিয়েশন সিকিউরিটি অডিটে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ৯৮ শতাংশ স্কোর পেয়েছে। একই মূল্যায়নে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পেয়েছে ৯৪ শতাংশ। অর্থাৎ এবারের নিরীক্ষায় দুই বিমানবন্দরের মধ্যে ওসমানীর স্কোর চার শতাংশ পয়েন্ট বেশি। তবে এই ফলাফলকে দেশের সামগ্রিক বিমানবন্দর নিরাপত্তার একটি নির্দিষ্ট নিরীক্ষার ফল হিসেবে দেখা উচিত; এটি বিশ্বের সব বিমানবন্দরের তুলনামূলক র্যাংকিং নয়।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) ২০ সেপ্টেম্বর এ তথ্য প্রকাশ করে। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যগামী যাত্রী ও কার্গোর নিরাপত্তাব্যবস্থাকে গুরুত্ব দিয়ে ডিএফটির এই মূল্যায়ন পরিচালিত হয়। এতে শাহজালাল ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের যাত্রী, কার্গো ও মেইল নিরাপত্তাসহ এভিয়েশন সিকিউরিটির বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হয়েছে।
এক বছরের ব্যবধানে দুই বিমানবন্দরই আগের চেয়ে ভালো করেছে। ২০২৫ সালের ডিএফটি মূল্যায়নে শাহজালালের স্কোর ছিল ৯৩ শতাংশ। এবার তা বেড়ে হয়েছে ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্কোর ২০২৫ সালে ছিল ৯৪ শতাংশ, যা এবার চার শতাংশ পয়েন্ট বেড়ে ৯৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে ঢাকার বিমানবন্দরের উন্নতি হয়েছে এক শতাংশ পয়েন্ট এবং সিলেটের বিমানবন্দরের উন্নতি হয়েছে চার শতাংশ পয়েন্ট।
ওসমানীর এই ফলাফল সিলেটের জন্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সিলেটের দীর্ঘদিনের যাত্রী যোগাযোগ রয়েছে এবং বিমানবন্দরটি প্রবাসী অধ্যুষিত এই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক যাতায়াতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। যুক্তরাজ্যগামী যাত্রীদের জন্য বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে কী অবস্থানে রয়েছে, সে বিষয়ে ডিএফটির মতো একটি বিদেশি কর্তৃপক্ষের মূল্যায়ন যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের জন্য আলাদা গুরুত্ব বহন করে।
তবে অডিটের ৯৮ শতাংশ স্কোরকে শুধু একটি সংখ্যায় সীমাবদ্ধ রাখলে এর তাৎপর্যের একটি অংশ অনালোচিত থেকে যায়। ডিএফটির মূল্যায়ন মূলত নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন পরীক্ষা করে। যাত্রী, কার্গো ও মেইল ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে বিমান চলাচলের নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবস্থা এই পর্যালোচনার আওতায় থাকে। ফলে স্কোর বৃদ্ধির অর্থ হলো সংশ্লিষ্ট নিরীক্ষায় নির্ধারিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাগুলোর বাস্তবায়নে আগের তুলনায় উন্নতি দেখা গেছে।
কার্গো নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য এসেছে গুরুত্বপূর্ণ একটি ফল। বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, Additional Measures Assessment-এ বাংলাদেশ ১০০ শতাংশ কমপ্লায়েন্স অর্জন করেছে। ইউরোপগামী কার্গো ও মেইলের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের High Risk Cargo and Mail বা HRCM ব্যবস্থার অতিরিক্ত নিরাপত্তা শর্তের আওতায় রয়েছে। এর ফলে ইউরোপমুখী কার্গো ও মেইল পরিবহনে অতিরিক্ত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া, সময় ও ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
সাম্প্রতিক অডিটের ফলাফলকে বাংলাদেশে কার্গো নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতির একটি ইতিবাচক সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এখানেও একটি বিষয় পরিষ্কার রাখা জরুরি—শুধু ডিএফটি অডিটে ভালো ফল পেলেই HRCM সংক্রান্ত অতিরিক্ত শর্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রত্যাহার হয়ে যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পৃথক ঝুঁকি মূল্যায়ন ও আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে হবে।
বাংলাদেশের বিমান চলাচল খাতের জন্য এই সময়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে আসন্ন আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার কারণে। আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থার (আইকাও) Universal Security Audit Programme–Continuous Monitoring Approach বা USAP-CMA অডিট আগামী ২৬ অক্টোবর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এই অডিটে বেবিচকের সদর দপ্তর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের এভিয়েশন সিকিউরিটি ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করা হবে।
এর আগে বেবিচক জানিয়েছিল, যুক্তরাজ্যের ডিএফটি এবং আইকাওয়ের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অডিট সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। জুলাইয়ে বেবিচক জানিয়েছিল, ওই দুই অডিটের প্রস্তুতির প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছিল। ডিএফটির সাম্প্রতিক মূল্যায়নের ফলাফল তাই পরবর্তী আন্তর্জাতিক নিরীক্ষার প্রস্তুতির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও অভিজ্ঞতা হিসেবে কাজ করতে পারে।
বেবিচকের সদস্য (নিরাপত্তা) এয়ার কমডোর মো. আসিফ ইকবাল এই ফলাফলের পেছনে বেবিচকের এভিয়েশন সিকিউরিটি ডিভিশন, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। বেবিচকের ভাষ্য অনুযায়ী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তদারকি, বেবিচক চেয়ারম্যানের দিকনির্দেশনা এবং বিভিন্ন বিভাগের পারস্পরিক সহযোগিতাও অডিট প্রস্তুতি ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছে।
সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরের ক্ষেত্রে ৯৪ শতাংশ থেকে ৯৮ শতাংশে উন্নীত হওয়ার বিষয়টি বিশেষভাবে নজরকাড়া। তবে এই সাফল্যকে ধরে রাখতে নিয়মিত নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড একবার অর্জন করলেই সেটি স্থায়ী হয়ে যায় না; নিয়মিত প্রশিক্ষণ, প্রক্রিয়ার সঠিক বাস্তবায়ন, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, জনবল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ধারাবাহিক তদারকির মাধ্যমে সেই মান ধরে রাখতে হয়।
একইভাবে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৯৩ শতাংশ থেকে ৯৪ শতাংশে উন্নীত হওয়াও বাংলাদেশের সামগ্রিক এভিয়েশন সিকিউরিটি ব্যবস্থায় ধারাবাহিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়। দুই বিমানবন্দরের ফলাফল পাশাপাশি দেখলে দেখা যায়, উভয় ক্ষেত্রেই এক বছরের ব্যবধানে স্কোর বেড়েছে, যদিও বৃদ্ধির মাত্রা এক নয়।
যাত্রীদের কাছে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কেবল অডিটের স্কোরের বিষয় নয়। নিরাপত্তা তল্লাশি কতটা সুশৃঙ্খল, কার্গো ব্যবস্থাপনা কতটা নির্ভরযোগ্য, মেইল ও পণ্য পরিবহনে নিয়ম মানা হচ্ছে কি না এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নির্ধারিত নিরাপত্তা প্রক্রিয়া বাস্তবে কতটা কার্যকর—এসব বিষয়ও যাত্রী ও ব্যবসায়িক অংশীজনদের আস্থার সঙ্গে জড়িত।
সাম্প্রতিক ডিএফটি অডিটে ওসমানীর ৯৮ শতাংশ স্কোর এবং কার্গো নিরাপত্তায় বাংলাদেশের ১০০ শতাংশ কমপ্লায়েন্স তাই নিঃসন্দেহে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। একই সঙ্গে এটি পরবর্তী পরীক্ষার জন্য একটি নতুন দায়িত্বও তৈরি করেছে—এই উন্নতি যেন সাময়িক কোনো সাফল্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, বরং নিয়মিত নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা ও তদারকির মাধ্যমে আরও সুসংহত হয়।
সিলেটের মানুষের কাছে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর শুধু একটি বিমানবন্দর নয়; এটি দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে বসবাসরত সিলেটের প্রবাসীদের যাতায়াতের সঙ্গে এই বিমানবন্দরের কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত। ফলে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিরীক্ষায় এর উন্নত ফলাফল যাত্রী আস্থা ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি বার্তা বহন করে।
এখন সামনে আইকাওয়ের অডিট। ডিএফটির সাম্প্রতিক মূল্যায়নে পাওয়া অগ্রগতিকে ভিত্তি করে নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বল জায়গাগুলো আরও শক্তিশালী করা গেলে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের বিমান চলাচল নিরাপত্তা কাঠামো আরও সুসংহত করার সুযোগ তৈরি হবে। আর সেই প্রক্রিয়ায় সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ৯৮ শতাংশ স্কোর যেমন একটি অর্জনের চিত্র তুলে ধরছে, তেমনি এই মান ধরে রাখার ধারাবাহিক চ্যালেঞ্জের কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে।


