প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের ছাদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে স্থাপন করা প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ টাকার সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি দীর্ঘদিন ধরে অচল হয়ে পড়ে আছে। প্রায় ৩০ কিলোওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পে স্থাপন করা সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, আইপিএসসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বছরের পর বছর ব্যবহার না হওয়ায় সরকারি বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি প্রায় আট বছর ধরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নেই।
নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং সরকারি কার্যালয়গুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের আওতায় বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের অধীনে ২০১৩ সালে শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের ছাদে এটি স্থাপন করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানা গেছে। প্রকল্পে ৩০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ১০০টি সোলার প্যানেলের পাশাপাশি ব্যাটারি, আইপিএস ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছিল।
প্রকল্পটি চালু থাকার সময়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়, উপজেলা পরিষদসহ কৃষি, মৎস্য, সমবায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের মতো বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে এর উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হতো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সরকারি বাসভবনেও এই বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সুবিধা পৌঁছাত বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।
অর্থাৎ যে উদ্দেশ্যে সরকারি অর্থ ব্যয়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পটি স্থাপন করা হয়েছিল, তার শুরুটা ছিল কার্যকর। কিন্তু প্রকল্প চালুর কয়েক বছরের মধ্যেই বিভিন্ন যন্ত্রাংশে ত্রুটি দেখা দিতে শুরু করে। ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে একপর্যায়ে পুরো প্রকল্পই অচল হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, প্রায় আট বছর ধরে সোলার প্যানেল, ব্যাটারি, আইপিএসসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ব্যবহার না করেই পড়ে আছে।
একটি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু প্যানেল বসিয়ে দিলেই দীর্ঘদিন কার্যকর থাকে না। প্যানেলের পাশাপাশি ব্যাটারি, ইনভার্টার, কন্ট্রোলার, কেবল, সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য যন্ত্রপাতির নিয়মিত পরীক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রয়োজন। বিশেষ করে ব্যাটারি ও ইলেকট্রনিক নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে থাকলে সেগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে কোনো প্রকল্প সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে দ্রুত কারিগরি পরীক্ষা করে পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২৬ সালে টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (SREDA), বিদ্যুৎ বিভাগের সংশ্লিষ্ট অংশীদার এবং জার্মান উন্নয়ন সহযোগিতা সংস্থা GIZ-সংশ্লিষ্ট উদ্যোগে বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স বা O&M নির্দেশিকা তৈরির কাজ নিয়ে কর্মশালাও অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সৌর প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কর্মক্ষমতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
সরকারি বিভিন্ন সৌর প্রকল্পের ক্ষেত্রেও রক্ষণাবেক্ষণকে প্রকল্প পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সরকারি একটি সাম্প্রতিক সৌর প্রকল্পের দরপত্রে প্যানেল পরিষ্কার, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা পরীক্ষা, ইনভার্টারের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং নির্ধারিত সময়ের O&M সহায়তার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকার উদাহরণ রয়েছে।
এ অবস্থায় শান্তিগঞ্জের প্রকল্পটি কেন দীর্ঘ সময় ধরে অচল পড়ে আছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প স্থাপনের সময় কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কার ওপর ছিল, প্রকল্পের যন্ত্রপাতির জন্য কত বছরের ওয়ারেন্টি বা মেইনটেন্যান্স সুবিধা ছিল, ত্রুটি দেখা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি কীভাবে জানানো হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না—এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করেই স্পষ্ট হওয়া সম্ভব।
আরও একটি বিষয় হলো, দীর্ঘদিন অচল থাকার কারণে প্রকল্পটি শুধু বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে বঞ্চিত করছে না; পুনরায় চালু করতে প্রয়োজনীয় ব্যয়ও বাড়তে পারে। আট বছর ধরে ব্যবহারের বাইরে থাকা যন্ত্রপাতির সবগুলো অংশ আদৌ মেরামত করে সচল করা সম্ভব হবে কি না, নাকি কিছু যন্ত্রাংশ নতুন করে প্রতিস্থাপন করতে হবে, সেটিও কারিগরি পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্টরা এমন একটি কারিগরি প্রাক্কলনের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
শান্তিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিল্লোল চাকমা জানিয়েছেন, তিনি নতুন দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন এবং বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনা করেছেন। প্রকল্পটি সচল করতে কত অর্থের প্রয়োজন হবে তা নির্ধারণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান বা বিশেষজ্ঞ দিয়ে একটি প্রাক্কলন করানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। ব্যয় তুলনামূলক কম হলে এবং উপজেলা তহবিলে প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান থাকলে সেই তহবিল থেকেই প্রকল্পটি সচল করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্টদের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রকল্পটি নতুন করে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে শুধু মেরামত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করাই যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে যাতে একই ধরনের সমস্যায় প্রকল্পটি আবার বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির নির্ধারণ এবং ত্রুটি দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যকর কাঠামো থাকা জরুরি।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর যে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, শান্তিগঞ্জের অভিজ্ঞতাও সেই প্রয়োজনীয়তাকে সামনে আনে।
প্রায় দেড় কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত একটি সরকারি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল প্রচলিত বিদ্যুতের ওপর চাপ কমানো, সরকারি দপ্তরগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহে সহায়তা করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো। কিন্তু বছরের পর বছর সেটি অচল পড়ে থাকলে সেই বিনিয়োগের কাঙ্ক্ষিত সুফল পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলোতে টেকসই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তাও সামনে আসে।
এখন তাই শান্তিগঞ্জের এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে দ্রুত কারিগরি মূল্যায়ন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং পুনরায় চালুর সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণের পাশাপাশি প্রকল্পটি কেন এত দীর্ঘ সময় অচল ছিল, তার প্রশাসনিক ও কারিগরি কারণও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। এতে একদিকে প্রকল্পটি পুনরায় সচল করার বাস্তবসম্মত পথ নির্ধারণ করা যাবে, অন্যদিকে সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত ভবিষ্যৎ সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা, রক্ষণাবেক্ষণ ও জবাবদিহির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া সম্ভব হবে।


